এনডিটিভি, রয়টার্স, সিএনএন : ইরানে ভূপাতিত এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমানের আটকে পড়া দুই মার্কিন বিমান সেনাকে উদ্ধারে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই অভিযানে মার্কিন বাহিনীকে অন্তত একটি, সম্ভবত দুটি উচ্চ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান হারাতে হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিমান সেনাকে (একজন কর্নেল) উদ্ধারের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের মরুভূমির একটি অস্থায়ী রানওয়েতে বেশ কয়েকটি বিশেষ পরিবহন বিমান মোতায়েন করে। কিন্তু সেখানে অবতরণের পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা মরুভূমির নরম মাটিতে আটকে যাওয়ার কারণে অন্তত একটি বা দুটি বিমান অকেজো হয়ে পড়ে।

ইরানি বাহিনী যখন চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছিল, তখন উদ্ধারকাজ শেষ করতে মার্কিন বাহিনীকে আরও অতিরিক্ত বিমান পাঠাতে হয়। বার্তা সংস্থা এপিকে একজন আঞ্চলিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণে ফেলে যেতে বাধ্য হওয়া দুটি পরিবহন বিমান মার্কিন সেনারা নিজেরাই বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও ইসফাহান প্রদেশের মরুভূমিতে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমানের পুড়ে যাওয়া অবশিষ্টাংশের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো লকহিড মার্টিন সি-১৩০ টাইপের বিমান—সম্ভবত এমসি-১৩০জে কমান্ডো টু সংস্করণ।

প্রতিটি যুদ্ধবিমানের মূল্য ১০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এগুলো সাধারণত শত্রু এলাকায় বিশেষ অভিযানের জন্য সেনা আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বিশেষ ধরনের হেলিকপ্টারের (সম্ভবত বোয়িং এমএইচ-৬ লিটল বার্ডস) অংশবিশেষও দেখা গেছে।

ফ্লাইট গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ছোট হেলিকপ্টারের পাল্লার বাইরের এলাকায় অভিযানের জন্য এগুলোকে এমসি-১৩০জে যুদ্ধবিমানের ভেতরে করে নিয়ে যাওয়া যায়।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, ‘শত্রুদের উড়ন্ত যানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আবারও একটি অপমানজনক পরাজয়ের শিকার হয়েছে।’

ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড পরে দাবি করেছে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লজ্জা এড়াতেই’ মার্কিন বাহিনী তাদের নিজেদের যুদ্ধবিমানে বোমা বর্ষণ করে ধ্বংস করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন নিজেদের বিমান ধ্বংস করল

ইরানি বাহিনী খুব কাছে চলে আসায় মার্কিন সেনারা বাধ্য হয়ে তাঁদের যুদ্ধবিমানগুলো উড়িয়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় সরঞ্জামগুলো যেন ইরানিদের হাতে না পড়ে। শত্রু এলাকায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের ক্ষেত্রে এটি সাধারণ একটি নিয়ম। এর আগে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার অভিযানের সময় অ্যাবোটাবাদেও মার্কিন বাহিনী একই নিয়ম অনুসরণ করেছিল।

এসব যুদ্ধবিমানে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নেভিগেশন ও বিশেষ সামরিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম থাকে। সরঞ্জামের আর্থিক মূল্যের চেয়ে এই গোপনীয়তা রক্ষা করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মার্কিন উদ্ধার অভিযান

রোববার মার্কিন বাহিনী নিখোঁজ আহত বিমান সেনাকে উদ্ধার করেছে, যাঁর বিমানটি শত্রুসীমানার ভেতরে বিধ্বস্ত হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওই সেনা ‘গুরুতর আহত কিন্তু অত্যন্ত সাহসী’ ছিলেন। তাঁকে ‘পাহাড়ের গভীর থেকে’ কয়েক ডজন সশস্ত্র বিমানের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ক্র্যাশ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিনের আলোতে দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকেও উদ্ধার করা হয়। মার্কিন প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় সেনাকে খুঁজে পাওয়ার আগে সিআইএ ইরানের ভেতরে গুজব ছড়িয়ে দেয়, তাঁকে পাওয়া গেছে এবং সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ইরানিদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এই অপ্রকাশিত তথ্যগুলো শেয়ার করেছেন।

মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু কীভাবে ইরানে লুকিয়ে ছিলেন

ইরানে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর এর এক ক্রু এক দিনের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ ছিলেন। পরে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে। উড়োজাহাজ ভূপাতিত হওয়ার পর ওই ক্রু কোথায় লুকিয়ে ছিলেন, কীভাবে তিনি ইরানি বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়েছেন, কীভাবে তাঁকে উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়েছে—এ সম্পর্কে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা।

ইরানে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়। এটি ছিল যুক্তরাজ্যের লেকেনহিথে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটির ৪৮ ফাইটার উইং-এর যুদ্ধবিমান। যুদ্ধবিমানটিতে দুজন ক্রু ছিলেন। একজন পাইলট, অন্যজন অস্ত্রব্যবস্থা–সংক্রান্ত কর্মকর্তা।

যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার সময় দুজনই সেখান থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। ঘটনার পর দ্রুত পাইলটকে খুঁজে পাওয়া গেলেও ওই অস্ত্রব্যবস্থা–সংক্রান্ত কর্মকর্তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

সূত্র বলেছে, শত্রুপক্ষের এলাকায় এক পাহাড়ের খাঁজে একা লুকিয়ে ছিলেন ওই মার্কিন কর্মকর্তা। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিল একটি পিস্তল, একটি যোগাযোগ যন্ত্র এবং একটি শনাক্তকরণ যন্ত্র। তিনি জানতেন, বাঁচতে হলে ধরা পড়া যাবে না। তার ওপর তাঁকে খুঁজে পেতে ইরানের নেতৃত্বও পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন।

সূত্র জানায়, একপর্যায়ে ওই মার্কিন কর্মকর্তা পাহাড় বেয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছান, যা ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ফুট উঁচুতে। ওই কর্মকর্তা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তবে ইরানি বাহিনী যেন তাঁকে শনাক্ত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে তিনি থেমে থেমে যোগাযোগ করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত উঁচু পাহাড়ে মার্কিন কমান্ডোদের একটি দল অভিযান চালিয়ে ওই নিখোঁজ কর্মকর্তাকে খুঁজে বের করে। যখন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা ওই অভিযানের পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় আলাদা করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও চেষ্টা চালাচ্ছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সদস্যরা ইরানের ভেতরে এমন তথ্য ছড়াচ্ছিল যে দুই ক্রু সদস্যই ইতিমধ্যে উদ্ধার হয়ে গেছেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা এমনটা করেছে।

এক ইসরাইলি কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, উদ্ধার অভিযান যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে ইসরাইলও কিছু পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করেছিল। দুই ইসরাইলি সূত্র বলেছে, তারা গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতাও করেছে।

শেষ পর্যন্ত ওই নিখোঁজ মার্কিন কর্মকর্তা কোথায় আছেন, তা শনাক্ত করতে সক্ষম হয় সিআইএ। তারা সামরিক বাহিনীকে এ তথ্য জানায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এই সাহসী যোদ্ধা ইরানের বিপজ্জনক পাহাড়ে শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ছিলেন, তাঁকে আমাদের শত্রুরা খুঁজে বেড়াচ্ছিল, ক্রমাগত কাছে চলে আসছিল। তবে সত্যিকার অর্থে তিনি কখনো একা হয়ে পড়েননি।’