এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমসর : মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌবহর পারস্য উপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতসংলগ্ন পানিসীমায় ইরানের একাধিক জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের যে কোনো হামলাকে তারা ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখবে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যুদ্ধ শুরু না হলেও এই মুহূর্তে উপসাগরীয় অঞ্চলটি উচ্চ সামরিক সতর্কতার মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বা সীমিত সংঘাতও বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বর্তমানে আন্দামান সাগরে অবস্থান করছে। এটি মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা করেছে। রণতরীটির সঙ্গে রয়েছে একাধিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, এফ-৩৫ ও অন্যান্য যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষম সহায়ক জাহাজ। এই নৌবহর আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরব সাগর হয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ভার্জিনিয়ার নরফোক নৌঘাঁটি ছেড়েছে। যদিও সেটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই নৌবহরকে ‘একটি বড় আর্মাডা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ইরানের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সরাসরি ইরানি উপকূলে না গিয়ে প্রথমে আরব সাগর বা পারস্য উপসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান নিতে পারে। কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি (যেখানে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড অবস্থিত), সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা ঘাঁটি এবং বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি ঘিরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কাতারে ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। এটি পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক মাত্রা আরও স্পষ্ট করছে।
উপসাগরে ইরানি জাহাজ : এমন উত্তেজনার মধ্যেই ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরে ইরানের পতাকাবাহী একাধিক জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আবু বকর ৮৩ নামের একটি জাহাজকে ইরানের কুহ মোবারাক ও আমিরাতের খোর ফাক্কান এলাকায় এবং মোহাম্মাদি ৫৯৯ নামের একটি জাহাজকে ওমান উপসাগরে মাস্কাটের কাছাকাছি দেখা গেছে। এ ছাড়া আরও অন্তত দুটি ‘অনির্দিষ্ট’ ইরানি জাহাজ আমিরাতসংলগ্ন পারস্য উপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে। তবে এই জাহাজগুলো সামরিক, না লজিস্টিকস–তা নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে এটি ইরানের প্রদর্শনমূলক নৌ তৎপরতার অংশ।
কঠোর হুঁশিয়ারি : তেহরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের যে কোনো ধরনের হামলাকে নিজেদের ওপর ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখবে ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘এবার কোনো সীমিত হামলার ধারণা নেই। যে কোনো আঘাতের জবাব আমরা সবচেয়ে কঠোরভাবে দেব।’
ইরানের সামরিক নেতৃত্বের ভাষায়, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও জর্ডানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি– সবই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইল ইরানের ওপর হামলার সুযোগ খুঁজছে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, ‘আমি আশা করি তারা অন্য কোনো পথ খুঁজে পাবে। বাস্তবতা হলো ইসরাইল বিশেষভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ খুঁজছে।’ এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ইউরোপের অন্তত দুটি বড় বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স দুবাইগামী ফ্লাইট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের বিমান সংস্থা কেএলএম ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবগামী ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর মোতায়েন মূলত ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সম্ভাব্য সংঘাতের প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতির অংশ। তবে ইরানের প্রকাশ্য ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’-এর হুঁশিয়ারি এবং উপসাগরে তাদের নৌ তৎপরতা পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সরাসরি যুদ্ধ শুরু না হলেও সামান্য ভুল হিসাব, দুর্ঘটনা বা সীমিত সংঘর্ষ থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করতে পারে।
এদিকে ইরানে হামলা চালানোর প্রস্তুতি শেষের কাছাকাছি আছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার দেশটির ইরানে হামলা চালাবে বলে ধারণা করছে ইসরাইল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম। তারা বলেছে, হামলার পর ইরান যে পাল্টা হামলা চালাবে সেটিরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন সেনারা। সংবাদমাধ্যমটি আরও বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে রণতরী, যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েনে যুক্তরাষ্ট্রের আর কয়েকদিন সময় লাগবে।
চ্যানেল-১২ জানিয়েছে, গত আটমাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে এবারই সবচেয়ে বড় সেনা ও যুদ্ধাস্ত্র জড়ো করছে যুক্তরাষ্ট্র। যার মধ্যে রয়েছে রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং ক্রুজার। এরসঙ্গে আছে ফাইটার স্কোয়াড্রোনস এবং বাড়তি আকাশ ও মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান ইরানের দিকে তাদের বিশাল নৌবহর যাচ্ছে। তার এমন মন্তব্যের পর ইরানে মার্কিনিদের হামলার গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এসব যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করতে চান না। এ বদলে ইরান সরকারের সঙ্গে সংলাপ চান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। যা অল্প সময়ের মধ্যে সরকারবিরোধী সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নেয় ইরানের নিরাপত্তাবাহিনী। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে প্রায় চার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প বিক্ষোভ চলার সময় হুমকি দিচ্ছিলেন ইরানে হামলা চালাবেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জানান ইরান হত্যা বন্ধ করে দেওয়ায় হামলার পরিকল্পনা থেকে তারা সরে এসেছেন।
ইসরাইলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড সাধারণ ইসরাইলিদের যে নির্দেশনা দিয়েছিল সেটি পরিবর্তন করেনি। কিন্তু যদি পরিস্থিতি পরিবর্তন হয় তাহলে নির্দেশনায় পরিবর্তন আনা হবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড হুমকি দিয়েছে এবার তাদের ওপর ছোট বা বড় হামলা চালানো হোক না কেন সেটিকে তারা সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে।