আল জাজিরা, রয়টার্স : ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে, তা দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। জেনেভায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই ঘটনার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তুর্ক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এখন প্রয়োজন সেই তদন্ত খুব দ্রুত সম্পন্ন করা এবং এর মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য প্রতিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, মিনাবে ঘটে যাওয়া এই হামলার ঘটনা মার্কিন সামরিক বাহিনী তদন্ত করছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, গত শনিবার ইরানের ওই বালিকা বিদ্যালয়ে যে হামলায় বহু শিশু নিহত হয়েছে, তার জন্য সম্ভবত মার্কিন বাহিনী দায়ী হতে পারে। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায়নি বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা।

তদন্ত সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। যেমন—এই প্রাথমিক মূল্যায়নে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, হামলায় কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বা কেন ওই স্কুলে হামলা হতে পারে—এসব বিষয়ও পরিষ্কার নয়। স্পর্শকাতর সামরিক বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, নতুন কোনো প্রমাণ সামনে এলে যুক্তরাষ্ট্র দায়মুক্তিও পেতে পারে এবং অন্য কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততার বিষয়ও উঠে আসতে পারে।

জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলি বাহরেইনি দাবি করেছেন, হামলায় ১৫০ জন ছাত্রী নিহত হয়েছে। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে প্রাণহানির এই সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রশ্নের জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, ঘটনাটি তদন্তাধীন থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করা অনুচিত। এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি হোয়াইট হাউস। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দপ্তর বর্তমানে বিষয়টি তদন্ত করছে। তার দাবি, ইরানের শাসকেরা নিজেদের বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যুক্তরাষ্ট্র তা করছে না। এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয় গত মঙ্গলবার এই হামলার ঘটনায় তদন্তের আহ্বান জানায়। তবে স্কুলে হামলার জন্য কারা দায়ী—সে বিষয়ে তারা কোনো পক্ষকে সরাসরি অভিযুক্ত করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্কুলে হামলার জন্য দায়ী: ইরানে গত শনিবার একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যে ভয়াবহ হামলা হয়েছে, তার জন্য সম্ভবত মার্কিন বাহিনীই দায়ী। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক মূল্যায়নেই এমন তথ্য উঠে এসেছে। দুজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তদন্তটি এখনো চলমান এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। তদন্তের বিস্তারিত বা কী ধরনের প্রমাণের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা উদ্ঘাটন করতে পারেনি। কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কিংবা কেন সেখানে হামলা চালানো হয়েছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানা যায়নি।

গত বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী এই ঘটনাটি তদন্ত করছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে নতুন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে যা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দোষ প্রমাণ করবে, তবে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ইঙ্গিত করছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের ওই বালিকা বিদ্যালয়টি গত শনিবার মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার প্রথম দিনেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়। জেনেভায় জাতিসংঘের নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনি জানিয়েছেন, এই হামলায় ১৫০ জন ছাত্রী নিহত হয়েছে। যদিও রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই প্রাণহানির সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। পেন্টাগন এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সেন্ট্রাল কমান্ডের কাছে প্রশ্নটি পাঠিয়ে দিয়েছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, তদন্তাধীন কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা এই মুহূর্তে অনুচিত হবে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, যুদ্ধ বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার) বিষয়টি তদন্ত করছে। তবে এটি মনে রাখা উচিত যে ইরানি শাসনব্যবস্থা বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে, যুক্তরাষ্ট্র নয়।

এর আগে সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ইচ্ছা করে কোনো স্কুলে হামলা করবে না। ইসরাইলি এবং মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান আক্রমণে তারা লক্ষ্যবস্তু ও ভৌগোলিক অঞ্চল ভাগ করে নিয়েছেন। ইসরাইল যখন পশ্চিম ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন দক্ষিণ ইরানে নৌ ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আক্রমণ করছে। মিনাব শহরটি দক্ষিণ ইরানে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে মার্কিন দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি জোরালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, ইচ্ছা করে স্কুল বা হাসপাতালে হামলা চালানো একটি যুদ্ধাপরাধ। যদি এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর হাতে বেসামরিক নাগরিক নিহতের অন্যতম নিকৃষ্টতম ঘটনা। গত মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নিহত ছাত্রীদের জানাজার দৃশ্য দেখানো হয়। ছোট ছোট কফিনগুলো ইরানি পতাকায় মোড়ানো ছিল এবং বিশাল জনসমুদ্রের ওপর দিয়ে সেগুলো কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।