আল জাজিরা : মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরতে শুরু করতেই আবার অশান্তির ছায়া দেখা দিচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। এমন অভিযোগ তুলেছে তেহরান। ইরানের দাবি, আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়ে গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করাই ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য। কাতারের দোহা সফরে আরবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ অভিযোগ করেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা এখন খুবই সংবেদনশীল পর্যায়ে আছে। ঠিক এই সময়েই ইসরায়েল নানা অজুহাত তৈরি করে আলোচনাকে ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।
লারিজানি স্পষ্ট করে জানান, ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই আলোচনা করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের কথা হচ্ছে না। কিন্তু তারপরও ইসরায়েল জোর করে এই প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ছে এবং আলোচনা নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইরানের এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও বলেন, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য শুধু ইরানকে ঘিরে নয়। তারা কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ককেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর আগেও কাতারের রাজধানীতে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা গোটা অঞ্চলের জন্য উদ্বেগজনক।
ইরানের অভিযোগ, গত বছরের জুনে ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা চলছিল। সেই হামলার কারণে আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে সম্প্রতি ওমানের মাসকাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। সেখানে মূলত বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। লারিজানি জানান, ইরান শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রও এখন আলোচনার পথেই সমস্যার সমাধান চায় বলে মনে হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই আলোচনা শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয় আলোচনায় নেই। কারণ, এসব ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত এবং শান্তিপূর্ণ কাজে, যেমন ক্যানসার চিকিৎসায়, ব্যবহৃত হয়। ইরানের মতে, যদি ইসরায়েল এভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে, তাহলে শুধু ইরান নয় পুরো মধ্যপ্রাচ্যই নতুন করে অস্থিরতার দিকে চলে যাবে।
এদিকে ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত দেশব্যাপী বিশাল গণসমাবেশে ইরানি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে ঊষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, এবারের ১১ই ফেব্রুয়ারির সমাবেশে ইরানিরা এক মহান কাজ সম্পন্ন করেছে, যা দেশকে অনন্য সম্মানের আসনে বসিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই অভূতপূর্ব উপস্থিতির মাধ্যমে জনগণ আবারও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি তাদের অকুতোভয় সমর্থন প্রমাণ করেছে এবং এর ফলে ইরানের শত্রুরা চরমভাবে হতাশ হয়েছে। যারা ইরানের আত্মসমর্পণের অপেক্ষায় ছিল, এই জনজোয়ার তাদের সমস্ত পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সর্বোচ্চ নেতা এই বিশাল সমাবেশকে ইরানের জাতীয় শক্তি, মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে সকলকে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজপথে জনগণের এই একীভূত স্লোগান তাদের প্রকৃত পরিচয় ও চারিত্রিক দৃঢ়তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। এবারের ৪৭তম বার্ষিকী এমন এক সময়ে পালিত হলো যখন গত জুন মাসে ইসরায়েল ও আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া ১২ দিনের যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে তীব্র অর্থনৈতিক ও মিডিয়া যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইরান পার হয়েছে। এছাড়া গত জানুয়ারি মাসেও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তকফিরি সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কোটি কোটি মানুষের এই রাজপথে নেমে আসা প্রমাণ করেছে, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ইরানি জাতি আপসহীন। রাজধানী তেহরানসহ ১৪শ'টিরও বেশি শহর ও গ্রামে বৃষ্টি ও তুষারপাত উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের এই উপস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ ছিল বলে জানা গেছে।