রয়টার্স : যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের চাহিদা বাড়ছে। এর ফলে বাজারের মূল্যায়নে অনিশ্চয়তার বিষয়টি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা পিজিআইএম ফিক্সড ইনকামের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহিল মার্কু বলেন, “২০২২-এর আগে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিনিয়োগের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল না। এখন বিভিন্ন সংকটের মাঝের সম্পর্ক যেভাবে বাজারের ভবিষ্যৎকে প্রাভাবিত করছে, তাতে এই বিশ্লেষণ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে গ্রাহকদের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ উদ্ভূত পরামর্শের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।” গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে শুল্ক হুমকি, রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসন, এবং এই মাসে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা বিনিয়োগকারীদের এই চাহিদা বাড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন নিজেদের প্রতিষ্ঠানেই বিশ্লেষক নিয়োগ দেওয়া, বিভিন্ন পরামর্শক সংস্থাকে বাণিজ্যিক নিয়োগ এবং পরিস্থিতি-ভিত্তিক পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বড় বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টকর্পের সিআইও ঋষি কাপুর বলেন, “আমাদের নতুন দক্ষতা তৈরি করতে হবে। আগে ভূ-রাজনীতি ছিল স্থিতিশীল পটভূমি; এখন এটি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।” ইন্দোনেশিয়ার ডানান্তারা ফান্ডের সিআইও পান্ডু পাত্রিয়া সাজারির বলেন, “রাজনৈতিক ঝুঁকি মূল্যায়নের সময় আমরা এখন সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি কি হতে পারে, প্রথমে তা বিবেচনা করি। এটি আমাদের বিনিয়োগ নীতি নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখে।” বর্ধিত চাহিদার প্রেক্ষাপটে একাধিক শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শ সংস্থা তাদের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সক্ষমতা জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যান অ্যান্ড চেজ ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের জন্য আলাদা করে ‘সেন্টার ফর জিওপলিটিক্স’ চালু করেছে। বহুজাতিক আর্থিক পরামর্শ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান লাজার্ড এবং মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস পৃথকভাবে ভূ-রাজনৈতিক পরামর্শ বিভাগ গঠন করেছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরামর্শ প্রতিষ্ঠান সিগনাম গ্লোবাল অ্যাডভাইজরস তাদের বিশ্লেষক দলের আকার গত বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণে বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপ জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান গ্রাহক চাহিদার তুলনায় এখনো পর্যাপ্ত বিশ্লেষক ও সেবা সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের নানান নীতির কারণে এই প্রবণতা আরও দ্রুত বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিসিজি সেন্টার ফর জিওপলিটিক্সের প্রধান মার্ক গিলবার্ট বলেন, বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, আগের চেয়ে বেশি জটিল হয়েছে এবং অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তিনি জানান, বিনিয়োগকারীরা এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন ও নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে আগ্রহী। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের কৌশল নতুন করে সাজানো হচ্ছে। একই সঙ্গে অস্থির বাজার পরিস্থিতিতে ঝুঁকি কমাতে ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ ও ধারণা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।