মিডল ইস্ট আই, আনাদোলু এজেন্সি, আল জাজিরা : গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিতে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব বিপুল ভোটে গৃহীত হয়েছে। অনুষ্ঠিত ভোটে নরওয়ে ও এক ডজনের বেশি দেশের উত্থাপিত এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৩৯টি দেশ। বিপক্ষে ভোট পড়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রসহ মাত্র ১২টি দেশের, আর ১৯টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। নরওয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মেরেট ফেজেল্ড ব্র্যাটেস্টেড প্রস্তাব উপস্থাপনকালে বলেন, ২০২৪ ছিল তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস বছরগুলির মধ্যে একটি। ২০২৫ সালও একইভাবে এগিয়ে এসেছে। সামনের বছরে এই ধারাটি সহজ হওয়ার কিছু লক্ষণ রয়েছে। অধিকৃত ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি একটি বিশেষ বিষয় মনে রাখা উচিত। বেসামরিক নাগরিকরা সর্বোচ্চ মূল্য দিচ্ছেন। মানবিক নীতির প্রতি শ্রদ্ধা ক্ষয় হচ্ছে। মানবিক আইনের সবচেয়ে মৌলিক নীতিগুলি চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রস্তাবে ইসরায়েলকে দখলদার শক্তি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা না দেওয়া, জাতিসংঘের স্থাপনায় হামলা বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই ভোট অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) অক্টোবর মাসে দেওয়া একটি পরামর্শমূলক মতামতের পর, যেখানে ইসরায়েলের আইনি দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। ব্র্যাটেস্টেড উল্লেখ করেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনি স্পষ্টতা চেয়েছিল, যা আইসিজের এই মতামতের মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়েছে। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জারাহে অবস্থিত ইউএনআরডব্লিউএ কম্পাউন্ডে ইসরায়েলের “অননুমোদিত প্রবেশ” জাতিসংঘ প্রাঙ্গণের অলঙ্ঘনীয়তার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর কমিশনার-জেনারেল ফিলিপ লাজ্জারিনি ভোটের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই ভোট আইসিজের সেই সিদ্ধান্তের জোরালো সমর্থন দেয়, যেখানে ইউএনআরডব্লিউএ-তে হামাসের অনুপ্রবেশের অভিযোগ কিংবা সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তিনি বলেন, এই ফলাফল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সিংহভাগের পক্ষ থেকে ইউএনআরডব্লিউএ-এর প্রতি দৃঢ় সমর্থনের স্পষ্ট বার্তা। ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিষদের স্পিকার রুহি ফাত্তুহও প্রস্তাব গৃহীত হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই বিপুল ব্যবধান ইউএনআরডব্লিউএ-এর আইনি ম্যান্ডেট ও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সুরক্ষায় এর মূল ভূমিকার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। তিনি একই সঙ্গে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদারি অপরাধ, জাতিগত নির্মূলের ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় বৃদ্ধি এবং ক্রমাবনতিশীল মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গাজায় অক্টোবর মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে অন্তত ৮২ শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ সহিংসতার ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস বলেন, ‘ইউনিসেফের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৮২ শিশু নিহত হয়েছে। এটি আবারও এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, যা অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার।’
গাজার মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে অন্তত ৩৮৬ জন নিহত এবং ৯৮০ জন আহত হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৫০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার সবগুলোই তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর আশপাশে সংঘটিত হয়েছে, যেখানে অন্তত ১২১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাতজন নারী, ৩০ জন শিশু এবং বহু আহতের ঘটনা আছে। যদিও ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবে গাজায় বসবাসের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এখনো ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে ইসরায়েল, যা চুক্তির মানবিক প্রোটোকল লঙ্ঘনের শামিল।