রয়টার্স : যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা চললেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে নেই। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে এমন তিনটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো এখনও মোটামুটি অটুট রয়েছে এবং তারা দেশের জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম। এসব প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার পতনের আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে না।
একটি সূত্র জানায়, সর্বশেষ গোয়েন্দা মূল্যায়ন কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযানটি শিগগিরই শেষ করা হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কঠোরপন্থি নেতৃত্ব যদি শক্ত অবস্থানে থাকে, তাহলে যুদ্ধের গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। যদিও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, তবুও দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব এখনো সংগঠিত রয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ আলোচনাতেও স্বীকার করা হয়েছে যে, এই যুদ্ধের ফলে ইরানের ধর্মীয় সরকার ভেঙে পড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতেও পারে এবং ইরানের ভেতরের রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স দপ্তর ও সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। হোয়াইট হাউসও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব। এসব হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কমান্ডারও নিহত হয়েছেন। তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি এবং খামেনির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী নেতারা এখনও দেশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। এদিকে শিয়া আলেমদের পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে ইসরাইলের একটি সূত্র বলেছে, তারা চায় না আগের সরকারের কোনো অংশ ক্ষমতায় টিকে থাকুক। তবে বর্তমান মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কীভাবে সরকারকে পুরোপুরি উৎখাত করা সম্ভব হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য স্থল অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, যাতে ইরানের সাধারণ মানুষ নিরাপদে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি। এদিকে ইরানের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। প্রতিবেশী ইরাকে অবস্থান করা ইরানি কুর্দি মিলিশিয়ারা পশ্চিম ইরানে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে বলে গত সপ্তাহে রয়টার্স জানিয়েছিল। ইরানি কুর্দিস্তানের কোমালা পার্টির প্রধান আবদুল্লাহ মোহতাদি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেলে হাজারো তরুণ অস্ত্র হাতে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত।তিনি আরও বলেন, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার ভয়ে কিছু নিরাপত্তা বাহিনী ঘাঁটি ছেড়ে চলে গেছে এমন খবরও তারা পেয়েছেন। তবে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর কাছে পর্যাপ্ত জনবল ও অস্ত্রশক্তি নেই, যা দিয়ে তারা দীর্ঘ সময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে পারবে। ইরানি কুর্দি সংগঠনগুলো সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে অস্ত্র ও সাঁজোয়া যান সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে ইরানে প্রবেশ করে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করেছেন।