রয়টার্স , এএফপি, এপি, বিবিসি : যদি সামরিক হুমকির বাস্তবায়ন ঘটায় বা কোনও ধরনের হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য হবে। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি এই কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই সতর্কবার্তা দেন ইরাভানি। এএফপি চিঠির অনুলিপিটি দেখেছে।
ইরান যাতে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমানসহ ব্যাপক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছেন। তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বোমা তৈরির জন্য নয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ইরান যদি চুক্তিতে না আসে, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারত মহাসাগরের দ্বীপসহ যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত ইরাভানি চিঠিতে লিখেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই যুদ্ধংদেহী বক্তব্য সামরিক আগ্রাসনের বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। চিঠিতে জানানো হয়, ইরান এখনও ‘কূটনৈতিক সমাধানে’ বিশ্বাসী এবং পারমাণবিক কর্মসূচির অস্পষ্টতা দূর করতে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে কোনও আগ্রাসন চালানো হলে আত্মরক্ষার্থে মধ্যপ্রাচ্যের সব শত্রু ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
এদিকে ট্রাম্প বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইরানের হাতে বড়জোর ১৫ দিন সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে সমাধান না হলে ওয়াশিংটন সামরিক হামলা চালাতে পারে বলেও আভাস দেন তিনি। গত মঙ্গলবার জেনেভায় মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানি কূটনীতিকদের পরোক্ষ বৈঠকে কিছুটা অগ্রগতির খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে উত্তেজনার পারদ এখনও নামেনি।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ইরানে অতর্কিত হামলা চালালে আগের আলোচনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১২ দিনের সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল। সেই থেকে দুই দেশের সম্পর্ক চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
১০ দিনের আলটিমেটাম ট্রাম্পের: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে কোনও চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, নাকি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা আগামী ১০ দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। ওয়াশিংটনে নবগঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী সভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই হুঁশিয়ারি দেন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, আমাদের একটি অর্থবহ চুক্তিতে আসতে হবে, অন্যথায় ভয়াবহ কিছু ঘটবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতির খবরও পাওয়া গেছে। ট্রাম্প জানান, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ‘খুব ভালো কিছু বৈঠক’ করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের সঙ্গে অর্থবহ চুক্তি করা সহজ নয়। যদি তা না হয়, তবে খারাপ কিছু ঘটবে।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও ইরানকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করা হবে তেহরানের জন্য ‘বুদ্ধিমানের কাজ’। ট্রাম্প এখনও কূটনৈতিক সমাধানের আশা করছেন বলে তিনি জানান। গত বছরের জুনে ইরানর তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। হোয়াইট হাউজ বর্তমানে নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মোতায়েনসহ সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরানও তাদের সামরিক স্থাপনাগুলো শক্তিশালী করছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন বাহিনীকে হুমকি দিয়ে লিখেছেন, আমেরিকার রণতরি বিপজ্জনক ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হলো সেই অস্ত্র যা ওই রণতরিকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দিতে পারে।
বিনা অনুমতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনও সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন ডেমোক্র্যাট এবং কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট রো খান্না এবং কেনটাকির রিপাবলিকান থমাস ম্যাসি ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার অ্যাক্ট’ ব্যবহার করে আগামী সপ্তাহে কংগ্রেসে ভোটাভুটির চেষ্টা করবেন।
রো খান্না বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ হবে বিপর্যয়কর। ৯০ মিলিয়নের এই দেশটির শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে এই প্রস্তাব পাস হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এর আগে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে একই ধরনের একটি প্রস্তাব আটকে দিয়েছিল রিপাবলিকানরা। ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার জন্য ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি যুক্তরাজ্য সরকার। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড এবং ভারত মহাসাগরে ব্রিটিশ দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহার করেছিল।