আল জাজিরা : ইসরাইলের গাজা অভিযানে প্রচুর বিদেশি নাগরিক সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। যুদ্ধ শুরু থেকে প্রায় ৭২,০০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হলেও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে অন্তত ৫০,০০০-এর বেশি সৈনিকের হাতে আরেকটি দেশের পাসপোর্ট রয়েছে, এমন তথ্য তুলে ধরেছে ইসরাইলের নাগরিক অধিকার সংগঠন হাসলাখা। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এই সৈনিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ ১২,১৩৫ জন সংখ্যায় রয়েছেন।এছাড়া ফ্রান্সের নাগরিক প্রায় ৬,১২৭ জন, রাশিয়ার প্রায় ৫,০৬৭ জন, এবং ইউক্রেনের ৩,৯০১ জন এতে অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও ইসরায়েলিদের সঙ্গে এই বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন নাগরিকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ ওঠায় আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণে এসব দ্বৈতনাগরিক সদস্যদের দায়ের বিষয়ও জটিল। কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সন্যাশনাল আইন বিশেষজ্ঞ ইলিয়াস বান্টেকাস বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যেকোনো যুদ্ধাপরাধের দায় নির্ভর করে জাতীয়তা নয়, কাজের ওপর। তবে বাস্তবে এসব ব্যক্তিকে আদালতে আনা ও বিচার করা কঠিন, বিশেষত সময়, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমঝোতা বা রাজনৈতিক চাপের মতো প্রভাবক থাকলে। এ পর্যন্ত গাজায় কোনো দ্বৈতনাগরিক সৈনিককে যুদ্ধাপরাধে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে মানবাধিকার গ্রুপ, বিশেষ করে উত্তর লন্ডনে অবস্থিত প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (পিসিএইচআর) এবং পাবলিক ইন্টারেস্ট ল’ সেন্টার (পিআইএলসি) ইতোমধ্যে মেট্রোপলিটন পুলিশকে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে, যেখানে কয়েকজন ব্রিটিশ-ইসরায়েলি নাগরিককে বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আইসিসি বা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের রোম সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলে তাদের বিচারের সুযোগও তৈরি হয়। ফিলিস্তিন ২০১৫ থেকে এই সনদের সদস্য থাকায় আইসিসির অধীনে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা থাকলেও প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। এছাড়া একটি বেলজিয়ামভিত্তিক হিন্দ রাজাব ফাউন্ডেশন গাজায় সম্ভাব্য অপরাধীদের শনাক্তে সামাজিক মিডিয়া থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং এক হাজারেরও বেশি সম্ভাব্য অভিযুক্তকে আইনি পদক্ষেপের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীদের দায়মুক্তি চলতেই থাকবে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের জটিলতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, আইনি, আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব, এবং বহু দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দিক থেকেও তা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে।
ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার নতুন ছক ইসরাইলের: ১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল। দেশটির কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজের উত্থাপিত একটি প্রস্তাব রোববার সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই আইনি প্রক্রিয়া মূলত ফিলিস্তিনিদের তাদের পৈতৃক ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। ১৯৮৪ সাল থেকে স্থগিত থাকা এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের মালিকানা প্রমাণের সুযোগ সীমিত করে তাদের জমি দখল করা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
ইসরাইলি আবাসন অধিকার সংস্থা 'বিমকোম'-এর মতে, পশ্চিম তীরের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমির কোনো আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন নেই। ব্রিটিশ শাসনামল বা জর্ডান শাসনের সময় মাত্র ৩০ শতাংশ ভূমির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছিল।
বর্তমান ইসরাইলি সরকার এখন ফিলিস্তিনিদের কাছে এমন সব নথিপত্র দাবি করছে যা সংগ্রহ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হওয়ায় বা যুগের পর যুগ ধরে বংশপরম্পরায় ভূমি ব্যবহার করায় তাদের কাছে কোনো দাপ্তরিক কাগজ নেই। ফলে প্রমাণের অভাবে এই বিশাল পরিমাণ ভূখণ্ড ডিফল্টভাবে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন হয়ে যাবে। এর আগে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একই ধরনের ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, নিবন্ধিত জমির মাত্র ১ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের নামে হয়েছে, আর বাকি ৯৯ শতাংশই ইসরাইলি রাষ্ট্র বা ব্যক্তিগত মালিকদের দখলে চলে গেছে। ইসরাইলি বসতিবিরোধী সংগঠন 'পিস নাউ' এই প্রক্রিয়াকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের 'পূর্ণ দখলদারিত্ব' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ২০২৪ সালে এক রুলে জানিয়েছিল, ইসরাইলের এই ধরনের ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং জনসংখ্যা স্থানান্তর সম্পূর্ণ অবৈধ। তা সত্ত্বেও বেইজিং বা ওয়াশিংটনের চাপের তোয়াক্কা না করে ইসরাইল তাদের বসতি সম্প্রসারণের লক্ষ্য পূরণে আইনি পথেই এগোচ্ছে। ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট এই নিবন্ধন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর করা একটি আবেদন গত মাসে খারিজ করে দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে এ নিয়ে কোনো রুল জারি করা অকালপক্ক হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অত্যন্ত ছোট একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতকে আরও উসকে দেবে।