আল জাজিরা, রয়টার্স,আনাদোলু এজেন্সি : ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর অঞ্চলে ইসরাইলের সাম্প্রতিক তৎপরতা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। গত সোমবার জর্ডানের রাজধানী আম্মানে এক সংবাদ সম্মেলনে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।

এক প্রতিবেদনে তুরস্কের বার্তা সংস্থা জর্ডান সফরে গিয়েছেন ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ। সেখানে জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ (২) এর সঙ্গে বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট পশ্চিম তীরে ইসরাইলের সাম্প্রতিক দখলদারিত্ব ও সম্প্রসারণবাদী তৎপরতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত সিদ্ধান্ত দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে পশ্চিম তীর অঞ্চলে নিজেদের দখলদারিত্ব কার্যক্রম বাড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনাকে চিরতরে নস্যাৎ করাই তেল আবিবের উদ্দেশ্য।

ইসরাইলের প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ আব্বাস বলেন, ‘ইসরাইলের এই দখলদারিত্বমূলক তৎপরতা শুধু দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং বিশেষ করে এ অঞ্চলের ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।'

এ পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে থামাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করে প্রেসিডেন্ট আব্বাস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ডে যাবতীয় দখলদারিত্ব কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। আমি তাকে সেই ব্যাপারটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এবং ফিলিস্তিনের অস্তিত্বের স্বার্থে এ ইস্যুতে তার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের বিষয়ে ইসরাইলি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা গত সোমবার জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে এই অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ বলে মনে করেন।

বরাতে ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করেন যে একটি স্থিতিশীল পশ্চিম তীর ইসরাইলকে নিরাপদ রাখে এবং বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এই নীতিতেই অটল রয়েছে। ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ অধিকৃত পশ্চিম তীরে দখলদারি বাড়ানোর জন্য নতুন কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করার পর হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই প্রতিক্রিয়া এলো। ইসরাইলি নিরাপত্তা ক্যাবিনেটের অনুমোদিত এই নতুন নিয়মগুলোর মাধ্যমে অবৈধ বসতি স্থাপনের জন্য জমি দখল করা সহজ হবে। বিশেষ করে হেব্রনের মতো বড় শহরগুলোতে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সরাসরি ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি মুসলিম প্রধান দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে একে ‘অবৈধ এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছে। তারা মনে করে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পশ্চিম তীরের ওপর অবৈধ সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পদক্ষেপকে ‘অস্থিতিশীল’ এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনি জনগণের নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে খর্ব করছে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকার এবং স্পেনও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসরাইলকে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক বা জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তনের যেকোনো একতরফা চেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। উল্লেখ্য, ইসরাইলি মন্ত্রী স্মোট্রিচ প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে চিরতরে কবর দেওয়া। তবে স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে যে, ইসরাইলের এই সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং দখলদারিত্ব গাজায় চলমান সহিংসতাকে আরও উসকে দিতে পারে এবং শান্তি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।