ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে অবিরাম হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এমনকি পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময়ও ফিলিস্তিনী এই উপত্যকায় কমেনি ইসরাইলী বর্বরতা। আনাদোলু, রয়টার্স, এপি

গত মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় ইসরাইল হামলা শুরু করার পর থেকে নিহত হয়েছে ৩ শতাধিক শিশু। এমন তথ্যই সামনে এনেছে জাতিসংঘের শিশু নিরাপত্তা ও অধিকার বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর গত ১০ দিনে গাজা উপত্যকায় কমপক্ষে ৩২২টি শিশু নিহত এবং আরও ৬০৯ জন আহত হয়েছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল বলেছেন, “গাজায় যুদ্ধবিরতি গাজার শিশুদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জীবনরেখা এবং পুনরুদ্ধারের পথের আশা প্রদান করেছিল।”

তিনি বলেন, “কিন্তু শিশুরা আবারও মারাত্মক সহিংসতা এবং বঞ্চনার চক্রেই নিমজ্জিত হয়েছে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য সকল পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে।”

ইউনিসেফের মতে, গাজায় নিহত শিশুদের বেশিরভাগই ছিল বাস্তুচ্যুত। তারা হয় অস্থায়ী তাঁবুতে বা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, গত ২৩ মার্চ দক্ষিণ গাজার আল-নাসের হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে হামলায় নিহত ও আহতদের মধ্যে শিশুরাও ছিল।

এছাড়া গত ২ মার্চ থেকে ইসরাইলি বোমা হামলার পুনরায় শুরু হওয়া এবং সাহায্য সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণ অবরোধের ফলে গাজার বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে সেখানকার ১০ লাখ শিশু গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বলে ইউনিসেফ জানিয়েছে।

প্রতিরোধযোগ্য শিশু মৃত্যু সম্ভবত বৃদ্ধি পাবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সংস্থাটি বলেছে, “গত ২ মার্চ থেকে গাজা উপত্যকায় কোনও সাহায্য প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় খাদ্য, নিরাপদ পানি, আশ্রয় এবং চিকিৎসা সেবা ক্রমশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধ।”

আর তাই গাজায় হামলা বন্ধ করে যুদ্ধবিরতি পুনঃস্থাপন এবং গাজায় মানবিক ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।

সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, বিশ্বের চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয় এবং শিশুদের হত্যা ও দুর্ভোগ অব্যাহত রাখতে দেওয়াও উচিত নয়। একইসঙ্গে প্রভাবশালী দেশগুলোকে ভয়াবহ এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছে ইউনিসেফ।

দীর্ঘ ১৫ মাস সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইসরাইল। তারপর প্রায় দু’মাস গাজায় কম-বেশি শান্তি বজায় ছিল; কিন্তু গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নে হামাসের মতানৈক্যকে কেন্দ্র করে মার্চ মাসের তৃতীয় গত সপ্তাহ থেকে ফের গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত ১৮ মার্চ থেকে গাজায় নতুন করে ইসরাইলী বিমান হামলায় ১ হাজার ৪২ ফিলিস্তিনী নিহত এবং আরও ২ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ইসরাইলের বর্বর এই হামলা চলতি বছরের জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে দিয়েছে।

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ইসরাইলী হামলায় আরও ৪২ ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় দুইশ। এর ফলে অবরুদ্ধ এই উপত্যকাটিতে নিহতের মোট সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার ৪০০ জনে পৌঁছে গেছে।

মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলী আক্রমণে আহত হওয়া আরও ১৮৩ জনকে গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংঘাতের শুরু থেকে আহতের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৮৩ জনে পৌঁছেছে। অনেক মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং রাস্তায় পড়ে থাকলেও উদ্ধারকারীরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।

গাজায় বৃহৎ অংশের দখল নিতে যাচ্ছে ইসরাইল

গাজায় সামরিক অভিযানের পরিসর বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে দেশটির সেনাবাহিনী বলেছে, ব্যাপকহারে জনগণকে সরিয়ে দিয়ে এই এলাকাগুলো ইসরাইলের নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা এ খবর জানিয়েছে।

বিবৃতিতে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছেন, লড়াই বিদ্যমান ছিল, এমন সব স্থান থেকেই জনগণকে সরানো হবে। এই অভিযানে গাজা থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী নির্মূল করা হবে এবং দখলকৃত এলাকাগুলো ইসরাইল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হবে।

ইতোমধ্যে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফা ও খান ইউনিসের আশেপাশে বসবাসকারীদের সতর্কবার্তা প্রদান করেছে ইসরাইলি বাহিনী। মানবিক এলাকা হিসেবে নির্ধারিত উপকূলীয় এলাকা আল-মাওয়াসির দিকে তাদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওই বিবৃতিতে গাজাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে কাটজ বলেছেন, গাজায় বসবাসকারী সবার কাছে আমার অনুরোধ- আপনারা হামাসকে নির্মূল করতে পদক্ষেপ নিন এবং জিম্মিদের ফেরত পেতে সহায়তা করুন। যুদ্ধ শেষ করার এটিই একমাত্র উপায়।

তার বক্তব্যের কিছুদিন আগে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, হামাসকে নিষ্ক্রিয় করা এবং বাকি ৫৯ জিম্মিকে ফেরত পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা।

কাটজের সাম্প্রতিক বক্তব্যে অবশ্য এটা স্পষ্ট নয় যে, কতটুকু ভূখণ্ড দখল নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইসরাইলি বাহিনীর এবং তাদের এই দখলদারত্ব কী স্থায়ী না অস্থায়ী। যদি স্থায়ীভাবে তারা নতুন ভূমি দখল করে, তবে ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

ইসরাইলী মানবাধিকার সংগঠন গিশা জানিয়েছে, গাজা উপত্যকায় সীমানার কাছে ইতোমধ্যে ৬২ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে সেনাবাহিনী। তাদের দখলীকৃত ভূখণ্ড গাজার মোট আয়তনের প্রায় ১৭ শতাংশ। ওই অংশটি বাফার জোন হিসেবে স্বীকৃত ছিল। যুদ্ধের সম্ভাবনা হ্রাস করার জন্য বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে সাধারণত সামরিক আগ্রাসন পরিচালনা করা হয় না।

ইসরাইলী বাহিনীর দখলকৃত বাফার জোনে পানির কুয়া, পয়োনিষ্কাশন পাম্পিং স্টেশন, পানি শোধনাগারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে। এছাড়া এখানেই রয়েছে গাজায় কৃষিচাষের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি। এগুলোর সুবিধা থেকে বাসিন্দাদের বঞ্চিত করার অর্থ হবে গাজার টিকে থাকার লড়াইয়ে চাপ আরও বৃদ্ধি করা।

‘নেতানিয়াহু প্রবেশ করা মাত্র গ্রেফতার করুন’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে হাঙ্গেরি সফরের ঘোষণা দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। চলতি সপ্তাহেই মধ্য ইউরোপের এই দেশটিতে সফরে যাচ্ছেন তিনি।

আরও বলা হয়েছে, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর আর্বানের আমন্ত্রণেই দেশটিতে সফরে যাচ্ছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী।

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আর্বানের কঠোর সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। পাশাপশি নেতানিয়াহু হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করা মাত্র আইসিসির পরোয়ানাকে সম্মান জানিয়ে তাকে গ্রেফতার করতে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংস্থা।

“আইসিসি’র অন্যতম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে হাঙ্গেরি এ আদালতকে সহযোগিতা করতে বাধ্য। আইসিসির কোনো নিজস্ব পুলিশ নেই, তাই এ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি আছে- এমন কোনো ব্যক্তি যদি আইসিসির কোনো সদস্যরাষ্ট্রে প্রবেশ করে তাহলে তাকে গ্রেফতার বা আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বাধ্যবাধকতা আছে। এক্ষেত্রে আইসিসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভর করে।”

“নেতানিয়াহু গুরুতর যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তাকে সফরের আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে আর্বান কার্যত এসব অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের অপমান করেছেন। তবুও হাঙ্গেরির প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে- আইসিসির বাধ্যবাধকতা মেনে চলুন এবং নেতানিয়াহু হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করা মাত্র তাকে গ্রেফতার করুন।”