রয়টার্স : সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী খালাফ আহমদ আল-হাবতুর। হোটেল, বিলাসবহুল ভবন, শিক্ষা ও নির্মাণ খাতে তাঁর বিনিয়োগ ও ব্যবসা বলতে গেলে একচেটিয়া। মোট সম্পদের পরিমাণ ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার বা তার চেয়েও বেশি। তাঁর অন্য পরিচয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু। একসময় এই দুজন দুবাইয়ের পাম জুমেইরাতে ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। নানা পাকচক্রে ফল ফলেনি। তবে দুজনের বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি। ২০১৬ সালে ট্রাম্প যখন প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করেন, তখন আল-হাবতুর পত্রিকায় কলাম লিখে মন্তব্য করেছিলেন, ট্রাম্প একজন কর্মবীর।
এই আল-হাবতুর হঠাৎ নিজের এক্স হ্যান্ডেলে ট্রাম্পের উদ্দেশে এক খোলাচিঠি লিখেছেন। হুট করে ইসরাইলের সঙ্গে আঁতাত করে ট্রাম্প ইরানে হামলা করে বসেছেন। সাত দিন যেতে না যেতে সেই যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ত্রাহি অবস্থা। আল-হাবতুর মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধে আমাদের অঞ্চলকে জড়াতে আপনাকে কে অনুমতি দিয়েছে? কিসের ভিত্তিতে এমন মারাত্মক সিদ্ধান্ত আপনি নিলেন?’ যুদ্ধের আঁচ শুধু আল-হাবতুরের আরব আমিরাতে নয়, আশপাশের দেশগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাঁদের সবার রাজত্ব ধসে যেতে পারে। সেই ভয় থেকেই এই চিঠি।
আল-হাবতুর আরও লিখছেন, ‘যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনি কি এর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মাথায় রেখেছিলেন? একথা কি আপনি বিবেচনা করেছিলেন, এই যুদ্ধ বিস্তৃত হলে সবার আগে পুড়ে মরবে উপসাগরীয় দেশগুলো? এই অঞ্চলের জনগণের এ কথা জিজ্ঞাসা করার অধিকার রয়েছে, যুদ্ধটা কি আপনার একার সিদ্ধান্ত, নাকি নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত?’ ট্রাম্প নিজেকে শান্তির মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত করতে ভালোবাসেন, সে লক্ষ্যে সম্প্রতি তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের কথাও ঘোষণা করেছেন। কিছুটা উষ্মা, কিছুটা বিদ্রূপের সুরে আল-হাবতুর লিখেছেন, শান্তির নামে যে ‘বোর্ড অব পিস’ তিনি ঘোষণা করলেন, তার কালি শুকানোর আগেই ট্রাম্প কেন এমন এক যুদ্ধ বাঁধিয়ে বসলেন, যে কারণে বিপদে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। তাহলে সেসব শান্তি উদ্যোগের কী হলো? শান্তির নামে যে অঙ্গীকার তিনি করলেন, তার পরিণতিই–বা কী? আল- হাবতুর লিখেছেন, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে প্রকৃত নেতৃত্ব ধরা পড়ে না। তা ধরা পড়ে প্রজ্ঞা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও শান্তি অন্বেষায়।
কেন এই চিঠি গুরুত্বপূর্ণ: উপসাগরের শাসক বলুন বা ব্যবসায়ী, তাঁরা কেউ-ই ঘুণাক্ষরেও ট্রাম্পের ব্যাপারে মুখ খোলেন না। ব্যবসায়িক স্বার্থ দিয়েই তাঁদের সম্পর্ক নির্ধারিত। এবার সেই স্বার্থে টান পড়েছে বলেই আল-হাবতুর মুখ খুলেছেন। তিনি আরব আমিরাতের কর্তাব্যক্তিদের অতি ঘনিষ্ঠ, তাঁদের সঙ্গে সলাপরামর্শ না করে এমন খোলাচিঠি তিনি লিখবেন, তা ভাবা যায় না। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো কী বিপদে পড়বে, তার একটা সরল হিসাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। তারা জানিয়েছে, চলতি যুদ্ধের ফলে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে উপসাগরের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে। সেই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুসারে, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বিনিয়োগ চুক্তির যে দায়দায়িত্ব রয়েছে, তা থেকে সরে আসার কথা ভাবছে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, যুদ্ধ বা অন্য বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকটের মুখে চুক্তিপত্র পরিবর্তনের আইনসম্মত বিধিব্যবস্থা রয়েছে।