প্রেস টিভি, এএফপি, রয়টার্স : ইসলামী বিপ্লবের প্রায় সাড়ে চার দশকের মধ্যে প্রথম সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছিল ইরান। অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভ একপর্যায়ে দাঙ্গায় রূপ নেয়। এতে সরকারি হিসাবেই সাড়ে তিন সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানী হয়। দেশটি শুরু থেকেই এ বিশৃঙ্খলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলাইলের হাত ছিল বলে অভিযোগ করলেও তার কোনো অকাট্য প্রমাণ তারা হাজির করতে পারেনি। তবে আসলেই তাতে ওয়াশিংটনের ইন্ধন ছিল বলে খোদ মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট কেনেথ হোমার বেসেন্ট স্বীকার করেছেন।

অর্থমন্ত্রী স্কট কেনেথ স্বীকার করেছেন যে, ওয়াশিংটন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইরানে মার্কিন ডলারের ঘাটতি তৈরি করেছিল। এ পদক্ষেপের কারণে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক পতন ঘটে এবং এমন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়, যা গত ডিসেম্বরের দাঙ্গার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের এক শুনানিতে অংশ নিয়ে সিনেটর কেটি এলিজাবেথ বয়েড দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট কেনেথকে প্রশ্ন করেন—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ওপর তথাকথিত ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি জোরদার করতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যা করেছি তা হলো দেশটিতে ডলারের সংকট তৈরি করা, এটি ডিসেম্বরে একটি দ্রুত এবং বিশাল চূড়ান্ত পরিণতির দিকে মোড় নেয়, যখন ইরানের অন্যতম বৃহত্তম ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তখন টাকা ছাপাতে হয়েছিল, দেশটির মুদ্রার মান হু হু করে পড়ে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ডলার সংকট তৈরি করার পাশাপাশি, একই চাপ প্রয়োগের অভিযানের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানিও ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনে। এর মাধ্যমে সাধারণ ইরানিদের ওপর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কঠোর করা হয় এবং প্রকাশ্যে দেশটিতে আর্থিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চালানো হয়।

গত ২০ জানুয়ারি এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট কেনেথ বলেছিলেন যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত ইরানের মুদ্রাকে দুর্বল করার জন্যই ডিজাইন করা হয়েছিল। গত ২৮ ডিসেম্বর যখন মুদ্রার অবমূল্যায়ন নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়, তখন ইসরাইলের মোসাদের সঙ্গে যুক্ত সুসংগঠিত দলগুলো সেখানে অনুপ্রবেশ করে। তারা বিক্ষোভকারী, নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি ভবন এবং মসজিদে হামলা চালায় এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষোভকে পরিকল্পিত সহিংসতায় রূপান্তর করে।

ইরানি পুলিশ দাঙ্গাকারী এবং তাদের পরিকল্পনাকারীদের আটক করেছে, যাদের মধ্যে বিদেশ থেকে অর্থ গ্রহণকারী এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক বহনকারী ব্যক্তিরাও রয়েছে। ইরানের পুলিশ প্রধান আহমাদ রেজা রাদান ব্যাখ্যা করেছেন যে, সমাবেশগুলো প্রথমে ‘বাজারের ব্যবসায়ীদের বৈধ অর্থনৈতিক প্রতিবাদ ছিল,’ কিন্তু ‘পরবর্তীতে সেগুলো দাঙ্গায় রূপ নেয়।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, আটক করা বেশ কয়েকজন ডলারের বিনিময়ে কাজ করার কথা স্বীকারও করেছেন, যা বিদেশি এনজিও এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমর্থনের দিকে ইঙ্গিত দেয়।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো পরে ওই দাঙ্গা এবং সরকারবিরোধী হামলায় মোসাদ-সংশ্লিষ্ট উপাদানের উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া উত্তর ইরাকে অবস্থিত কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত উগ্রপন্থিরাও সহিংসতায় যোগ দিতে ইরানে প্রবেশ করেছিল। বছরের পর বছর ধরে ইরান কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরানসহ সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর আন্তঃসীমান্ত হামলার শিকার হচ্ছে, যারা প্রায়ই বিদেশি মদদে কাজ করে থাকে। ট্রাম্প এবং তার ইসরায়েলি সহযোগীরা বারবার বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরানের দমন-পীড়ন নিয়ে ‘সাজানো গল্প’ ব্যবহার করেছেন, যাতে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সংঘাত ও যুদ্ধের দিকে এগোনো যায়।

তেহরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা: ওমানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী মাসকটে গতকাল শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্টের প্রতিনিধিদলের আলোচনা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর তেহরানের তেল রপ্তানির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। ওই নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটির তেল পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করছে। তবে এ পদক্ষেপ ওমানে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ওমানে ইরান ইস্যুতে হওয়া আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওমানে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শেষে গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প এ কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইরানও ওমানে দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়েছে। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে বলেও আশা প্রকাশ করেছে তেহরান। তারা উপসাগরীয় দেশ ওমানে এক দিনের এ আলোচনায় ‘ইতিবাচক পরিবেশের’ প্রশংসা করেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার মধ্যে কয়েক দিন আগে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল মার্কিন নৌবহর মোতায়েন করেছেন ট্রাম্প। নৌবহরটি এখনো ইরানের জলসীমার কাছাকাছি রয়েছে। উত্তেজনা হ্রাসে ওমানের মধ্যস্থতায় মাসকটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল আলোচনা করেছে। তবে তারা মুখোমুখি আলোচনা করেনি। গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের ১২ দিনের সংঘাতের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলার পর এটাই দুই বৈরী দেশের মধ্যে প্রথম আলোচনা।

‘খুব ভালো আলোচনা হয়েছে’: ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে যাওয়ার পথে এয়ারফোর্স ওয়ানে ইরান ইস্যুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ইরান ইস্যুতেও আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই আমরা আবার বৈঠকে বসব।’ যদিও এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ওরা (ইরান) যদি কোনো চুক্তি না করে, তাহলে পরিণতি হবে খুবই কঠোর।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সপ্তাহজুড়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার পর গতকাল ওমানে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ আলোচনা হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ আলোচনার জন্য ওমানের রাজধানী মাসকটে যান। অন্যদিকে ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার আলোচনায় অংশ নেন।