এএফপি : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ শক্তির হামলা ইরানে প্রথম আঘাত হানে গত শনিবার সকাল নয়টার পর। মঙ্গলবার সকালে এই সংঘাতের ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এখনো পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। জড়িত তিনটি দেশ সংঘাত বন্ধের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
আলজাজিরা ও বিবিসির ওয়েবসাইটে লাইভ ব্লগের তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ দিনে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরায় তেল শিল্প অঞ্চলে একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন ধরে যায়। ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে লেবানন তাদের কয়েকটি ইউনিটের সেনা সরিয়ে নিয়েছে। পশ্চিম ইরানের হামাদানে যৌথ শক্তির হামলায় অন্তত ৫ ইরানি নিহতের খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন ২৫ জন। অন্যদিকে কেরমান প্রদেশে হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ ইরানি সেনা। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতের চতুর্থ দিনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস বাহরাইনের শেখ ইসা এলাকায় একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। ফার্স নিউজ এজেন্সি প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক রকেট বিস্ফোরিত হচ্ছে। ফার্স জানিয়েছে, আইআরজিসির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শেখ ইসা অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে একটি কমান্ড ও স্টাফ বিল্ডিং ধ্বংস হয়েছে। জ্বালানির ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘটনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র এখনও কোনো মন্তব্য করেনি।
জ্বালানি উৎপাদন স্থগিত: ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দুকুম বন্দরে একটি জ্বালানি ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, হামলার ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। কয়েকদিন আগেও এই বন্দরে ড্রোন হামলা হয়েছিল। তখন এক শ্রমিক প্রাণ হারান।
ওমানের নিকটবর্তী দেশ কাতারে সোমবার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যা বিশ্বের মোট সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। দেশটির বেশ কিছু স্থাপনায় ইরানি হামলার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সৌদি আরবও তাদের অন্যতম বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ শোধনাগারে উৎপাদন স্থগিত করেছে।
দ্রুত দাম বাড়ছে: ইউরোপের বেঞ্চমার্ক গ্যাসের দাম মঙ্গলবার ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বেঞ্চমার্ক গ্যাসের দামও বেড়েছে ৩০ শতাংশ। উভয় বাজারেই এখন ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর থেকে সর্বোচ্চ মূল্যে গ্যাস লেনদেন হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি তাদের স্থাপনাগুলোতে সামরিক হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় সোমবার গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ে। ট্রেডিং ইকোনমিক্স-এর তথ্য অনুযায়ী, সীমিত মজুত সক্ষমতা এবং আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে।
সৌদিতে মার্কিন দূতাবাসে হামলা: রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে দুটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এক্স-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এ ঘটনায় সীমিত মাত্রার অগ্নিকাণ্ড এবং ভবনের সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সৌদি আরবে জেদ্দা, রিয়াদ এবং জাহরানে যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের কর্মীদের জন্য পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এ হামলার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’
বৈরুত, তেহরানে বিস্ফোরণ: ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের তিনটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠীটির দাবি, লেবাননের ডজনখানেক শহর ও জনপদ লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। টেলিগ্রামে তিনটি পৃথক পোস্টে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা গোলান মালভূমির নাফাহ ঘাঁটিতে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করেছে। এছাড়া উত্তর ইসরায়েলের মেরন এবং রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন দিয়ে হামলা করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এখন পর্যন্ত এই দাবির বিষয়ে মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, মঙ্গলবার লেবাননের বৈরুত ও ইরানের তেহরানে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে। বিবিসি প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে ভবন থেকে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। ইসরায়েল বলছে, তাদের পদাতিক বাহিনী লেবাননের আরও কৌশলগত এলাকা দখল করতে অগ্রসর হবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ‘ইসরায়েলি সীমান্ত জনপদগুলোতে হামলা রোধ করার লক্ষ্যে আইডিএফকে লেবাননের আরও কৌশলগত এলাকা দখল এবং সেখানে অগ্রসর হওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন।
চিরকাল যুদ্ধ চালানোর অস্ত্রভাণ্ডার: যুক্তরাষ্ট্রের মাঝারি ও উচ্চ-মাঝারি মানের গোলাবারুদের মজুত নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শুধু এই সরঞ্জাম ব্যবহার করে চিরকাল যুদ্ধ চালানো সম্ভব। নিজের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প এমন কথা লিখেছেন। ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় সোমবার মধ্যরাতে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প আরও লিখেন, ‘আমাদের কাছে এই অস্ত্রগুলোর প্রায় সীমাহীন সরবরাহ আছে। যুক্তরাষ্ট্র সমৃদ্ধ এবং বড় জয়ের জন্য প্রস্তুত।’
আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ: জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম জলপথ হরমুজ প্রণালী অনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের কথা জানিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানের সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই পথ দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, কোনো জাহাজ পথটি অতিক্রমের চেষ্টা করলে হামলা চালানো হবে। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আইআরজিসির একজন শীর্ষস্থানীয় এই বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে বিপ্লবী গার্ডসের প্রধান কমান্ডারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী বন্ধ। কেউ যদি পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে বিপ্লবী গার্ডস এবং নিয়মিত নৌবাহিনীর সেনারা জাহাজে আগুন দেবে।’
দ্রুতই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন: ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতার নাম দ্রুত ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বা বিশেষজ্ঞ পরিষদের এক সদস্য। এ দায়িত্বে থাকা পরিষদের এক সদস্য দেশটির সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ-কে বলেছেন, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে না।আলি মোয়াল্লেমি নামের ওই সদস্য বলেন, বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা শপথ নিয়েছেন যে নতুন নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির প্রতি ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ কিংবা রাজনৈতিক ও দলীয় গোষ্ঠীস্বার্থ ভূমিকা রাখবে না। তারা কেবল নিজেদের বিচারবুদ্ধি ও ধর্মীয় নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে ভোট দেবেন।
চীনের অস্বীকার: চীন ক্রমাগত যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে। বেইজিং ইরান সরকারকে বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেছে এবং স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা ইরানের নিজস্ব ভূখণ্ড ও স্বার্থ রক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে। তবে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপকে সমর্থন করেননি। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ বা সামরিকভাবে সাহায্য করার কথা অস্বীকার করেছে। তারা বলছে, তাদের সমর্থন কেবল রাজনৈতিক ও নৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার আহ্বান: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকদের ১৪টি দেশ অবিলম্বে ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। কনস্যুলার বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরা নামদার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছেন, ‘গুরুতর ঝুঁকির’ কারণে পররাষ্ট্র দপ্তর মার্কিন নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব, যে পরিবহনব্যবস্থা আছে তা ব্যবহার করে ১৪টি দেশ থেকে বেরিয়ে যেতে বলছে। এই দেশগুলোর মধ্যে আছে- বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন।