এএফপি,আলজাজিরা : ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক হামলা শুরু করেছে দখলদার ইসরায়েল। গতকাল শনিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত উপত্যকাটিতে নতুন করে ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে সর্বশেষ হামলায় গাজার পুলিশ সদরদপ্তরকে টার্গেট করেছে ইসরায়েলি সেনারা। সেখানে সাতজন নিহতসহ বহু মানুষ আহত হয়েছেন। পুলিশের সদরদপ্তর গাজা সিটির শেখ রেদওয়ান এলাকায় অবস্থিত। এরআগে ভোরে মধ্য গাজায় পাঁচজন এবং দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসিতে আরও সাতজন নিহত হন। সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলের নতুন হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।
গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। চার মাস ধরে চলা এ যুদ্ধবিরতি শুরু থেকেই নড়েবড়ে ছিল। ইসরায়েলের দখলদার সেনারা যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ওই যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল পাঁচশর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। সাংবাদিক হানি মাহমুদ মধ্য গাজা থেকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলের নতুন এ হামলার পর গাজার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলি সেনারা এতদিন বিক্ষিপ্ত হামলা চালালেও আজ সকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধে ইসরায়েল ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের গাজার রাফাহ ক্রসিং বন্ধ রেখেছে। এতে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছেন সীমান্তের দুই পারে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। গত দুই বছর ধরে হাজার হাজার বাসিন্দা গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি যুদ্ধের কারণে। আবার একই কারণে বহু মানুষ গাজার সঙ্গে বাইরের সংযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসা সংকট কাটাতে বহু ফিলিস্তিনি রাফাহ ক্রসিং দিয়ে পার হওয়ার অপেক্ষা করছেন। ইসরায়েল ইতোমধ্যে ক্রসিং খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। কবে নাগাদ তা বাস্তবায়ন হবে তা কেউ জানেন না।
কমপক্ষে ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি কায়রোতে ফিলিস্তিনি দূতাবাসে নিবন্ধন করেছেন। তারা গাজায় ফিরতে চান। পরিবারের সদস্য ও স্বজনের সঙ্গে মিলিত হতে চান। ফিলিস্তিনি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ক্রসিংটি পুনরায় খোলার বিষয়টি এখনও আলোচনার অধীনে রয়েছে। মিডলইস্ট মনিটর জানায়, রাফাহ ক্রসিং গাজা উপত্যকা এবং মিসরের মধ্যে একমাত্র সীমান্ত পয়েন্ট; যা গাজার মানুষকে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। গত দুই বছর ধরে গাজার অধিকাংশ মানুষ এখান দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার অনুমতি পাননি যুদ্ধ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে।
বাসিন্দারা জরুরি চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন। কারণ, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা যুদ্ধ ও অবরোধে ভেঙে পড়েছে। অনেক রোগী, বিশেষ করে জীবন-সংকটাপন্ন রোগীরা বাইরে চিকিৎসা পেতে চাইলেও পারছেন না। বহু সংখ্যক রোগী এবং আহতরা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, কারণ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেই। আবার পরিবার ও জীবনযাত্রা পুনরুদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন হাজারো ফিলিস্তিনি। যুদ্ধের কারণে বহু পরিবার আলাদা হয়ে গেছে। তারা আবার মিলিত হতে বা গাজা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চাইছেন। বিদেশে গিয়ে জীবনযাত্রা পরিবর্তনের প্রত্যাশাও রয়েছে শত শত ফিলিস্তিনির।
নিহতের সংখ্যা স্বীকার ইসরায়েলি বাহিনীর : ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় নিহতের সংখ্যাসংক্রান্ত ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের যথার্থতা স্বীকার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ তথ্য অস্বীকার করে আসছিল। হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনী জানিয়েছে, প্রায় ৭১ হাজার নিহতের সংখ্যা মোটের ওপর সঠিক। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ব্যক্তিরা এতে অন্তর্ভুক্ত নন।
সর্বশেষ মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ শহরের আল-আকসা শহিদ হাসপাতালে হুসাম আবু করিমের মরদেহ ও পাঁচজন আহত ব্যক্তিকে আনা হয়। চিকিৎসা সূত্র জানায়, মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের মাক্কি গোলচত্বরের কাছে একটি ইসরায়েলি ড্রোন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তারা হতাহত হন। চিকিৎসা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, অক্টোবরের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৯২ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৩৫৬ জন আহত হয়েছেন। দুই বছরের হামলায় এ পর্যন্ত ৭১ হাজার ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির কার্যক্রম শেষ : ১৫ ফিলিস্তিনির মরদেহ হস্তান্তর করেছে ইসরায়েলের। এর মাধ্যমে প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির সব কার্যক্রম শেষ হয়ে গেল। শুরু হলো যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ। গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে হামাসের কাছ থেকে সবশেষ জিম্মির মরদেহ ফেরত পেয়েছে ইসরায়েল। এর তিন দিন পর ১৫ ফিলিস্তিনির মরদেহ ফেরত দিল তারা। বৃহস্পতিবার রেড ক্রসের মধ্যস্থতায় এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মধ্যস্থতাকারীরা আশা করছেন, এর মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর পথ সুগম হবে। রেড ক্রস কমিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এর মাধ্যমে কয়েক মাসব্যাপী অভিযানের সমাপ্তি হলো।