বিবিসি, রয়টার্স : দেশজুড়ে টানা বিক্ষোভ, কঠোর দমননীতি ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতাকাঠামোয় এখনো বড় ধরনের ভাঙনের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ স্তরে বিভক্তি তৈরি না হলে বিশ্বের স্থিতিস্থাপক সরকারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত, ইরানের শাসনব্যবস্থা আপাতত টিকে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের দুজন সরকারি সূত্র এবং দুজন বিশ্লেষক রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

সরকারি সূত্র ও বিশ্লেষক রয়টার্সকে বলেছেন, রাস্তার আন্দোলন ও বিদেশি চাপ যদি ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত বিভক্তি তৈরি না করতে পারে, তাহলে দুর্বল হলেও শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ইরান-আমেরিকান গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভালি নাসর বলেছেন, ইরানের বহুস্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে। যার কেন্দ্রে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ আধাসামরিক বাহিনী, এই সরকারকে ভেঙে ফেলাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। এই দুই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ। তিনি আরও বলেছেন, এ ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে জনসমাগম থাকতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভেতরে, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীতে, ভাঙন ও দলত্যাগ ঘটতে হবে। সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার বলেছেন, এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে বিক্ষোভকারীদের এমন গতি তৈরি করতে হবে, যা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, ধর্মীয় শাসনের প্রতি অনুগত এবং ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার বিশাল ভূগোল ও বৈচিত্র্যকে অতিক্রম করতে পারে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেম বলেছেন, ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অতীতের বেশ কয়েকটি অস্থিরতার ঢেউ কাটিয়ে উঠেছেন। ২০০৯ সালের পর এটি পঞ্চম বড় অভ্যুত্থান, সরকার যখন গভীর, অমীমাংসিত অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তখনও স্থিতিস্থাপকতা এবং সংহতির প্রমাণ দিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন, টিকে থাকা মানেই স্থিতিশীলতা নয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি প্রায় শ্বাসরুদ্ধ, পুনরুদ্ধারের কোনো স্পষ্ট পথ নেই। কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপ, ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বড় ক্ষতির ফলে ইরানের আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষ ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ইরানের শাসকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি। বিক্ষোভ দমনে ইরানে কঠোর অভিযান নিয়ে একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন তিনি । গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে। উল্লেখ্য, এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চলমান বিক্ষোভে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন, নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্যদের মৃত্যু ঘটিয়েছে যাদের তিনি সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আগে প্রায় ৬০০ মৃত্যুর হিসাব দিয়েছিল।

এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি: একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কীভাবে মারা যায়? আর্নেস্ট হেমিংওয়ে যেমন দেউলিয়া হওয়ার প্রসঙ্গে বলেছিলেন- ‘ধীরে ধীরে, তারপর হঠাৎ।’ ইরানের বিক্ষোভকারীরা এবং বিদেশে থাকা তাদের সমর্থকরা আশা করছিলেন, তেহরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা এখন সেই ‘হঠাৎ’ পর্যায়ে এসে পড়েছে। কিন্তু লক্ষণ বলছে, যদি এই শাসনের মৃত্যু হয়ও, তা এখনো ‘ধীরে ধীরে’ পর্যায়েই রয়েছে। গত দুই সপ্তাহের অস্থিরতা শাসন ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করেছে। ইরানে ক্ষোভ ও হতাশা আগেও বহুবার রাজপথে বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে এবারের বিস্ফোরণ ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে একের পর এক সামরিক আঘাত করেছে। কিন্তু সাধারণ ইরানিদের জন্য, যারা পরিবারকে খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নিষেধাজ্ঞা থেকে।

ইরানের অর্থনীতির জন্য সর্বশেষ বড় ধাক্কা আসে গত সেপ্টেম্বরে, যখন বৃটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স ২০১৫ সালের (বর্তমানে কার্যত মৃত) পারমাণবিক চুক্তির আওতায় তুলে নেয়া জাতিসংঘের সব নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করে। ২০২৫ সালে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ডিসেম্বর মাসে ইরানি মুদ্রা রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ইরানের শাসনব্যবস্থা প্রবল চাপে থাকলেও, প্রমাণ বলছে- এটি এখনই ভেঙে পড়ছে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরাপত্তা বাহিনী এখনো শাসন ব্যবস্থার প্রতি অনুগত। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ সময় ও অর্থ ব্যয় করে একটি জটিল ও নির্মম দমনমূলক কাঠামো গড়ে তুলেছে। গত দুই সপ্তাহে সরকারের বাহিনী রাস্তায় নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ মেনে নিয়েছে। এর ফলাফল হলো- সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর বিক্ষোভ আপাতত শেষ হয়ে গেছে। যদিও এটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন, কারণ দেশটির শাসকরা এখনও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। বিক্ষোভ দমনের অগ্রভাগে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তারা দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক প্রতিষ্ঠান। এই বাহিনীর নির্দিষ্ট দায়িত্ব হলো ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ ও শাসনব্যবস্থা রক্ষা করা। তারা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে জবাবদিহি করে। ধারণা করা হয়, আইআরজিসির সশস্ত্র সদস্য সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। তারা ইরানের প্রচলিত সেনাবাহিনীর সমান্তরালে কাজ করে। পাশাপাশি, তারা ইরানের অর্থনীতিরও বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষমতা, অর্থ, দুর্নীতি ও আদর্শের এক শক্তিশালী মিশ্রণ আইআরজিসিকে বর্তমান ব্যবস্থা রক্ষায় সর্বোচ্চ স্বার্থসংশ্লিষ্ট করে তুলেছে।

আইআরজিসির একটি সহায়ক বাহিনী রয়েছে বা বাসিজ মিলিশিয়া। এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক সংগঠন। তারা দাবি করে তাদের সদস্য সংখ্যা মিলিয়নেরও বেশি। পশ্চিমা কিছু হিসাব অনুযায়ী, সক্রিয় বাসিজ সদস্যের সংখ্যা কয়েক লাখ। যা কোনোভাবেই ছোট নয়। বিক্ষোভ দমনে বাসিজরাই থাকে সবচেয়ে সামনে।

আমি ২০০৯ সালে তেহরানে আইআরজিসি ও বাসিজকে কাজ করতে দেখেছি। সে সময় বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিশাল বিক্ষোভ দমনে তারা মাঠে নামে। বাসিজ স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত, হাতে রাবারের লাঠি ও কাঠের ডাণ্ডা। তাদের পেছনে থাকত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী ইউনিফর্ম পরা বাহিনী। মোটরসাইকেল স্কোয়াডগুলো তেহরানের প্রশস্ত সড়কজুড়ে তাণ্ডব চালাত, বিক্ষোভকারীদের ছোট ছোট দলে আক্রমণ করত। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে রাজপথজুড়ে থাকা বিশাল বিক্ষোভ সীমিত হয়ে পড়ে কিছু ছাত্রের স্লোগান ও আবর্জনার স্তূপে আগুন দেয়ার মধ্যে। সন্ধ্যা নামলে মানুষ বারান্দা ও ছাদে উঠে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিত, ঠিক যেমন তাদের বাবা-মায়েরা শাহের বিরুদ্ধে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেটিও থেমে যায়। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর এই দৃঢ়তা মানে এই নয় যে সর্বোচ্চ নেতা বা তার সহযোগীরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এখনও পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিচ্ছেন। আর যে লক্ষ লক্ষ ইরানি শাসনের পতন চান, তাদের ক্ষোভ ও ক্রোধ জমে উঠছে। তেহরানে সরকার ও সর্বোচ্চ নেতা চাপ কিছুটা কমানোর পথ খুঁজছেন বলে মনে হচ্ছে। একদিকে আগ্রাসী সরকারি বক্তব্য, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার প্রস্তাব- এই দুইয়ের মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এমন কোনো চুক্তি হওয়া কঠিন, যা আগের আলোচনা ব্যর্থতার ইতিহাস পেরিয়ে যেতে পারে। তবে আলোচনা শুরু হলে ইরান কিছুটা সময় নিতে পারে- বিশেষ করে যদি ট্রাম্পকে বোঝানো যায় যে কোনো না কোনো চুক্তি সম্ভব। চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। বাস্তবে এটি কীভাবে কাজ করবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ ইরানের বেশির ভাগ তেল কেনে চীন। গত শরতে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাণিজ্যযুদ্ধে একটি সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছান এবং আগামী এপ্রিলে বেইজিংয়ে একটি শীর্ষ বৈঠকের কথা রয়েছে। বৈশ্বিক দুই পরাশক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সেখানে আলোচিত হবে। ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে গিয়ে ট্রাম্প কি সেই বৈঠক ঝুঁকির মুখে ফেলবেন?

তেহরানে বয়সজনিতভাবে দুর্বল হয়ে পড়া সর্বোচ্চ নেতা খামেনির প্রধান লক্ষ্য একটাই- ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। ভবিষ্যতে আরও বিক্ষোভ হলে তার জবাব হবে কঠোর।

শাসনের একটি বড় সুবিধা হলো- বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের অভাব। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে বিপ্লবে উৎখাত হওয়া শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র সেই শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করছেন। তবে পারিবারিক ইতিহাস ও ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তার গ্রহণযোগ্যতাকে সীমিত করেছে। তেহরানের আলেম ও সামরিক নেতৃত্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হতে পারে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অভিজ্ঞতা। একসময় মনে হয়েছিল, তিনি যুদ্ধে জিতে গেছেন এবং সৌদি আরব ও আরব লীগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ফিরে পাচ্ছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষ দিকে তিনি হঠাৎই একটি সুসংগঠিত বিদ্রোহী আক্রমণের মুখে পড়েন। রাশিয়া ও ইরান- তাঁর দুই প্রধান মিত্র কেউই তাকে বাঁচাতে চায়নি বা পারেনি। কয়েক দিনের মধ্যেই আসাদ পরিবারসহ মস্কোতে নির্বাসনে পালিয়ে যান।

স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়, তারপর হঠাৎ ভেঙে পড়ে। আসাদের সিরিয়া ভেঙে পড়েছিল চোখের পলকে। আরেকটি উদাহরণ, যা তেহরানে আলোচিত হতে পারে, ২০১১ সালে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলির পতন, যখন সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর বদলে বিক্ষোভকারীদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। বেন আলির পতনের পরই মিশরের হোসনি মুবারক পদত্যাগে বাধ্য হন। সেনাবাহিনী যদি নিজের স্বার্থ রক্ষায় সিদ্ধান্ত না নিত যে মুবারককে সরতেই হবে, তবে হয়তো তিনি বিশাল বিক্ষোভও টিকে যেতে পারতেন। ইরানে কি তেমন কিছু ঘটতে পারে? সম্ভব। কিন্তু এখনই নয়। ইসলামি শাসনের বিরোধীরা আশা করবেন- ভিতরে ও বাইরে আরও চাপ বাড়বে, একটি বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, আর তখন এই ক্ষয়ের গতি ‘ধীরে ধীরে’ থেকে ‘হঠাৎ’-তে রূপ নেবে।