সিএনএন : টানা চার সপ্তাহ ধরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিশ্বজুড়ে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের একটি বড় অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের অব্যাহত হুমকি এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার আশঙ্কায় এই পথে বর্তমানে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ বললেই চলে। এই গভীর জ্বালানিসংকট নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় চলাচলের ব্যবস্থার কথা বললেও বাস্তবে ইরান এখনো এই অঞ্চলে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইরানের অপ্রথাগত যুদ্ধকৌশল—যেমন সস্তা ড্রোন ও সমুদ্র মাইনের ব্যবহার—যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তির জন্য এই জলপথকে সামরিকভাবে সুরক্ষিত করা কঠিন করে তুলেছে। ইরান খুব সহজেই এই সরু প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যা আধুনিক নৌবাহিনীগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া এই পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইরানের জন্য আর্থিকভাবেও লাভজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৩ মার্চ লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, অন্তত দুটি বড় জাহাজ নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পেতে ইরানকে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করেছে। ইরানি কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করেছেন যে, নির্দিষ্ট কিছু ট্যাঙ্কারের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তারা এই ধরনের ফি বা মাশুল আদায় অব্যাহত রাখবে।

এই অচলাবস্থা নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো স্পষ্ট সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান তার ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রাখার নীতি বজায় রেখেছে। এই সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে কেবল জ্বালানি নয়, বরং খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকটের আশঙ্কাও প্রবল হচ্ছে।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নজিরবিহীন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৭ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। মাসের শুরুর দিকে সংঘাত চরমে পৌঁছালে এই দাম ১১৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, মার্কিন তেলের মানদণ্ড ডব্লিউটিআই (ডঞও) ক্রুড বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৩ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে মাত্র এক মাসেই তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের এই চড়া দামের মূল কারণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা। যেহেতু বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে যায়, তাই দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের আশঙ্কায় গোল্ডম্যান স্যাকস এবং জেপি মরগানের মতো সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দিয়েছে যে, সংকট না মিটলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ থেকে ১৫০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে দেওয়া আলটিমেটামের সময়সীমা আরও ১০ দিন বাড়ানোয় এবং কয়েকটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি মেলায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছে।