ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া : আরব সাগরে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে এবং প্রতিপক্ষের নৌবাহিনীকে চাপে রাখতে এক বড় সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির নৌবাহিনী তাদের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘ফেজ-২’ প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের মূল আকর্ষণ হলো সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি পি-২৮২ ‘স্ম্যাশ’ সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তর্ভুক্তি উত্তর আরব সাগরে পাকিস্তানের ‘অ্যান্টি-অ্যাক্সেস/এরিয়া ডিনায়াল’ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে ভারতের বিমানবাহী রণতরী বা ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের একচ্ছত্র আধিপত্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশাল এবং ব্যয়বহুল নৌবহর তৈরি না করেও কীভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সাগরে পরাস্ত করা যায়—পাকিস্তান এখন সেই কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। ৩০০ কিলোমিটার পাল্লার পুরনো সাবসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যুগ শেষ করে এখন শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী (সুপারসনিক) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে তারা।
ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের পর শব্দের চেয়ে আড়াই গুণ (ম্যাক ২.৫+) বেশি গতিতে শত্রুর যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানতে সক্ষম। উপরন্তু, এটি উপর থেকে একদম খাড়াভাবে নিচে নেমে আসে এবং পথ পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে শত্রু জাহাজের রাডার বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে এটিকে মাঝআকাশে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
ভারতের নৌ-ডকট্রিন মূলত আইএনএস বিক্রান্ত বা আইএনএস বিক্রমাদিত্য-র মতো বড় বড় বিমানবাহী রণতরীর মাধ্যমে সাগরে শক্তি প্রদর্শনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পাকিস্তানের এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কারণে ভারতীয় রণতরীগুলোকে এখন পাকিস্তানের উপকূল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করতে হবে।
উপকূল থেকে রণতরীর দূরত্ব যত বাড়বে, তার ফাইটার জেটের কার্যক্ষমতা এবং সাড়াদানের গতি ততই কমে যাবে। ফলে যেকোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এটি ভারতের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
পাকিস্তানের এই উপকূলীয় সুরক্ষার পেছনে কৌশলগত অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এবং গোয়াদর বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামাবাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই এই ‘স্ম্যাশ’ ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে চীনের অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির মিল খুঁজে পাচ্ছেন। যদিও পাকিস্তান একে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তি বলে দাবি করেছে।
করাচির মেরিটাইম টেকনোলজিস কমপ্লেক্স (এমটিসি) কর্তৃক তৈরি এই অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি (এএসএমবি) মূলত উপকূলীয় মোবাইল লঞ্চার এবং যুদ্ধজাহাজ—উভয় প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণযোগ্য। প্রায় ৯ মিটার দীর্ঘ এই ক্ষেপণাস্ত্রটিতে রয়েছে প্রায় ৩৮৪ কেজি ওজনের উচ্চ-বিস্ফোরক ওয়ারহেড, যা নিখুঁতভাবে শত্রুর নৌযান বা উপকূলীয় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। এর ভূমিতে মোতায়েনকৃত উন্নত সংস্করণের পাল্লা ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কাগজে-কলমে এই প্রযুক্তি পাকিস্তানের জন্য বড় শক্তির উৎস হলেও বাস্তব যুদ্ধে এর কার্যকারিতা এখনো প্রমাণিত নয়। এই ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আক্রমণের জন্য শক্তিশালী রাডার ও ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজন। এছাড়া ভারতের ‘বারাক-৮’-এর মতো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই ক্ষেপণাস্ত্রকে কতটা রুখে দিতে পারে, তাও দেখার বিষয়।
তবে প্রযুক্তিগত বিতর্ক যাই থাক, আরব সাগরে পাকিস্তানের এই নতুন ‘মিসাইল শিল্ড’ বা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাচীর যে দক্ষিণ এশিয়ার নৌ-রাজনীতিতে এক নতুন উত্তাপের জন্ম দিয়েছে—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।