ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ইসরাইলী বাহিনীর বর্বর হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬১ ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। এদিন গাজায় মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। এছাড়া অনাহার ও অপুষ্টিতে মৃত্যু হয়েছে আরও চারজনের। এর মধ্যে দুজনই শিশু। আলজাজিরা, ওয়াফ, আনাদোলু এজেন্সি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকে গাজাজুড়ে ইসরাইলী হামলায় অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জন ছিলেন ত্রাণের খোঁজে যাওয়া সাধারণ মানুষ বলে আলজাজিরাকে জানিয়েছে চিকিৎসা সূত্র। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গাজার রাজধানী নগরীর পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে তীব্র বোমাবর্ষণ চালানো হয়েছে। গাজা নগরী দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইলী সেনারা। এটি গাজা উপত্যকার সবচেয়ে বড় নগরকেন্দ্র। তবে আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা করছে, এ অভিযানে ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটবে এবং সেখানে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনী বাস্তুচ্যুত হবেন। বাসিন্দাদের মতে, গাজা নগরীতে বহু পরিবার তাদের ঘর ছেড়ে উপকূলের দিকে ছুটছে। এ সময় ইসরাইলী বাহিনী শুজাইয়া, জায়তুন ও সাবরা এলাকায় তীব্র বোমাবর্ষণ চালায়।

গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কেবল জায়তুনের দক্ষিণাংশেই ১৫০০টিরও বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে, সেখানে সব ভবন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলী কর্মকর্তারা গাজা নগরীকে হামাসের শেষ শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসরাইলী সেনারা জানিয়েছে, তারা পুরো গাজাজুড়ে যোদ্ধাদের ও তাদের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিন যোদ্ধাকে হত্যা করেছে, তবে তাদের পরিচয় কীভাবে নিশ্চিত হয়েছে তা জানায়নি। গত বৃহস্পতিবার নিহতদের মধ্যে খানের ইউনিসে বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবু শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক নারী ও তার শিশুও রয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা গুম হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনীদের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে খাবারের খোঁজে যাওয়া একজন শিশুসহ কিছু মানুষ জোরপূর্বক নিখোঁজ হয়েছেন। সাতজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ক্ষুধার্ত মানুষকে গুম করা কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং এটি নির্যাতনের শামিল। তারা আরও বলেন, খাবারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক ও গণহারে মানুষ নিখোঁজ করার প্রক্রিয়া এখনই বন্ধ করতে হবে। গাজায় তীব্র মানবিক সংকটের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুই শিশুসহ আরও চারজন অপুষ্টি ও অনাহারে মারা গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্ষুধা-সংক্রান্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে, এর মধ্যে ১২১ শিশু।

আলজাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজযুম দেইর আল-বালাহ থেকে জানিয়েছেন, অত্যন্ত করুণ দৃশ্য চোখে পড়ছে। পরিবারগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচণ্ড গরমে স্যুপ রান্নার লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রায়ই খালি হাতে ফিরছে। অন্যরা আবার জীবন ঝুঁকিতে ফেলে খাবারের জন্য বিতরণকেন্দ্রে ছুটছে।

‘স্মোটরিচের গাজা দখলের পরিকল্পনা

সরাসরি যুদ্ধাপরাধের স্বীকারোক্তি’

ফিলিস্তিনী জাতীয় পরিষদের (পিএসি) চেয়ারম্যান রুহি ফাত্তুহ বৃহস্পতিবার ইসরাইলী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের গাজা অবরোধ ও ধাপে ধাপে দখলের প্রস্তাবকে ‘গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, হামাস আত্মসমর্পণ না করলে এবং সব বন্দিকে মুক্তি না দিলে গাজার পূর্ণ অবরোধ ও পরবর্তীতে অঞ্চলটি দখল করার স্মোটরিচের আহ্বান ‘গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের নীতির সরাসরি স্বীকৃতি’Íযা আন্তর্জাতিক আইন, চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন ও রোম সংবিধির আওতায় সম্পূর্ণ যুদ্ধাপরাধ। ফাত্তুহ জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের ‘উস্কানিমূলক বক্তব্য’ এখন আর কেবল চরমপন্থি মতামত নয়, বরং সরকারিভাবে কার্যকর হচ্ছে। প্রায় দুই বছরের অবরোধের মধ্যে এটি স্পষ্ট যেখানে ত্রাণকেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তু, অবকাঠামো ধ্বংস এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির চেষ্টা চলছে। তার ভাষায়, ইসরাইল ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে প্রত্যক্ষ অংশীদার’। তিনি দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরাইলী বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকেও নিন্দা জানান।

ফাত্তুহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদকে তাদের আইনি ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, গাজা সিটি দখল করে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে। এজন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ, ইসরাইলী নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। অন্যদিকে, স্মোটরিচ তার কথিত ‘গাজা বিজয় পরিকল্পনা’তে গাজা সিটি ও শরণার্থী শিবিরগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্র ঘোষণা করে হামাস সদস্যদের ‘ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মৃত্যুর’ মুখে ঠেলে দেওয়ার কথা বলেন। এছাড়া তিনি ধাপে ধাপে গাজা দখল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিলিস্তিনী বাস্তুচ্যুতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলা শুরুর পর থেকে ইসরাইলী বাহিনীর হাতে অন্তত ৬৩ হাজার ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এ ছাড়া ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও (আইসিজে) মামলা চলছে।

গাজার নিহত সাংবাদিকের চিঠি পড়ে জাতিসংঘে

আবেগে ভেঙে পড়লেন আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত

নিহত গাজা সাংবাদিকের চিঠি পড়ে জাতিসংঘে আবেগে ভেঙে পড়লেন আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত ইসরাইলী হামলায় গাজায় নিহত সাংবাদিকের চিঠি পড়ে জাতিসংঘে আবেগে ভেঙে পড়লেন আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আমর বেনজামা। ফিলিস্তিনী সাংবাদিক মরিয়ম আবু দাক্কার সেই বিদায়পত্র, যা তিনি নিজের ছেলে গাইথের উদ্দেশে লিখেছিলেন মৃত্যুর আগেই। ৩৩ বছর বয়সি আবু দাক্কা এই সপ্তাহের শুরুতে গাজার নাসের হাসপাতালের ওপর ইসরাইলী হামলায় নিহত পাঁচ সাংবাদিকের একজন। ওই হামলায় আরও ২০ ফিলিস্তিনী প্রাণ হারান। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ১৩ বছর বয়সি ছেলেকে উদ্দেশ করে আবু দাক্কা লিখেছিলেন, ‘তুমি তোমার মায়ের প্রাণ আর আত্মাৃ আমি মারা গেলে আমার জন্য কেঁদো না, দোয়া করো। আর তুমি বড় হলে, বিয়ে করলে, আর কন্যাসন্তান জন্মালেÍতার নাম রেখো মরিয়ম, আমার নামে।’

বেনজামা বলেন, মরিয়মের এই বিদায়বার্তাই ‘যে কোনো সরকারি বিবৃতির চেয়ে বেশি সত্য বহন করে’। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আবু দাক্কার হাতে ছিল কেবল একটি ক্যামেরা, আর শরীরে কেবল প্রেস ভেস্ট। সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে গাজার সত্য লুকিয়ে রাখতেই ইসরাইল এভাবে হত্যা চালাচ্ছে। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৪৫ সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। গত আগস্টের শেষ দিকে আরও ছয়জনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে আইডিএফ। তারা সঙ্গে রাখে কেবল শব্দ, ছবি আর কণ্ঠস্বরÑকিন্তু এই পরিষদ এই নৃশংসতার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’ তিনি ২ বছরের ক্ষুধার্ত শিশু ইয়াজান আবু ফুলের ঘটনাও তুলে ধরেনÍযাকে অস্থি-চর্মসার অবস্থায় বাবার কোলে দেখা গিয়েছিল। বেনজামা বলেন, ‘একটি শিশুকে এভাবে ধুঁকে যেতে দেখা গাজার বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।’

তিনি গাজাকে ‘জীবন্ত নরক’ আখ্যা দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে সমালোচনা করেনÍযা তার মতে ‘শোক প্রকাশের থিয়েটারে’ পরিণত হয়েছে। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দেওয়া, ব্যাপক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ‘গণহত্যা থামানোর’ আহ্বান জানান। বেনজামা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ব্যর্থতা মানে সহযোগী হওয়া। বিলম্ব মানে লজ্জা মেনে নেওয়া। গণহত্যা ঠেকানো কোনো বিকল্প নয়, এটি একটি দায়িত্ব।’ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ ও ত্রাণকর্মীরা সতর্ক করেন, গাজা জুড়ে দুর্ভিক্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ সময় ১৪ সদস্য ‘ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে ‘অবিলম্বে, নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি’র আহ্বান জানান। এছাড়া তারা সব বন্দির মুক্তি এবং ত্রাণ সহায়তা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কথা বলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘোষণায় সই করতে অস্বীকৃতি জানায়। ইসরাইলী আগ্রাসনে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৩ হাজার ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া উপত্যকায় দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারণ করেছে। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োযভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এছাড়া ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও (আইসিজে) মামলা চলছে।