এপি, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল : মাত্র ছয় সপ্তাহের ইরান যুদ্ধ ওলটপালট করে দিয়েছে গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা বিশ্ববাণিজ্যের চেনা সমীকরণ। ‘মুক্ত সমুদ্রে অবাধ বিচরণ’, যে নীতির ওপর ভর করে সমৃদ্ধ হয়েছে বিশ্বের বহু জাতি ও মানুষ, আজ তা খাদের কিনারে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ধমনী হরমুজ প্রণালি এখন এক নতুন ‘বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার’ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর যেখানে শান্তির সুবাতাস বইবার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। প্রায় ২০ হাজার নাবিক এখন সমুদ্রে কার্যত জিম্মি। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোন জাহাজ এই ৩০ মাইল প্রশস্ত জলপথ দিয়ে পার হবে আর কাকে কত মাসুল দিতে হবে, তা ঠিক করবে তারাই। মার্কিন নৌবাহিনীর চোখের সামনেই কার্যকর হচ্ছে এই ‘তেহরান টোল বুথ’। একসময়ের ‘সমুদ্রের শাসক’ আমেরিকার অসহায়ত্ব এখন প্রকাশ্য।
আমেরিকা একসময় মুক্ত সমুদ্রের নিশ্চয়তা দিত, কিন্তু এখন তারা নিজেরাই সেই পথ বন্ধ হতে দেখছে। হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে দক্ষিণ চীন সাগর, সব মিলিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের সেই নিরাপদ সোনালী দিনগুলো এখন কেবলই ইতিহাস। যেখানেই মুক্ত সমুদ্রের সমাপ্তি ঘটছে, সেখানেই শুরু হচ্ছে জোরজবরদস্তির নতুন অধ্যায়। হরমুজ প্রণালির কাছে এখন আটকা পড়ে আছে ৭ শতাধিক জাহাজ। এসব জাহাজে রয়েছে হাজার কোটি ডলারের পণ্য। দিনরাত মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন আর মিসাইল ওড়ার পর এখন ইরানি নৌবাহিনী রেডিও বার্তার মাধ্যমে চরম হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। তাদের স্পষ্ট বার্তা: ‘অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে তা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’
জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং মালিকরা দিশেহারা। সিরীয় ক্যাপ্টেন আলী কানাফানি ভিডিও কলে সমুদ্রের দিগন্তরেখা দেখিয়ে বলেন, ‘আগের মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আমার সামনেই ৩০টি জাহাজ আটকা পড়ে আছে অনুমতির অপেক্ষায়।’ এক লিবিয়ান ক্যাপ্টেনও তাকে ফোন করে জানতে চাইছিলেন নতুন নিয়মকানুন সম্পর্কে। কিন্তু উত্তর কারও জানা নেই। সবাই এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান যদি এভাবে মাসুল আদায় চালিয়ে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হবে। অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড যদি এই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, তবে জ্বালানি বাজারে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। ইউরোপীয় শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল সোতিরাস রাপ্তিস বলেন, ‘নাবিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারলেই কেবল অবাধ বাণিজ্য সম্ভব। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি পুরো উল্টো।’ হরমুজ প্রণালির এই ‘টোল বুথ’ সংস্কৃতি ১৭শ শতাব্দীর সেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী আমলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন পর্তুগিজ বা অটোমানরা জাহাজ থামিয়ে কর আদায় করত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের এই উদাহরণ অনুসরণ করতে পারে চীনও। দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
সাবেক মার্কিন নৌ কর্মকর্তা এবং ইতিহাসবিদ সালভাতোর আর. মারকোগ্লিয়ানো বলেন, ‘নীল জলপথের ধারণাটি হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলাম যা দ্রুতগতির বাণিজ্যের উপযোগী ছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যেন ১০০ মাইল বেগে গাড়ি চালিয়ে আমরা একটি ইটের দেওয়ালে ধাক্কা খেলাম।’ এই সংকটের ঢেউ লেগেছে মার্কিন ডলারের আধিপত্যেও।