সংগ্রাম ডেস্ক
রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মহলের প্রতি আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ ও মানবিক সহায়তা খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষায় সহায়তা জোরদার করা জরুরি।
মঙ্গলবার ব্যাংককে অনুষ্ঠিত রিজিওনাল হিউম্যানিটারিয়ান পার্টনারশিপ উইক (আরএইচপিডব্লিউ) ২০২৫-এর আন্তর্জাতিক সেমিনারে এই আহ্বান উঠে আসে। কোস্ট ফাউন্ডেশন ও কক্সবাজার সিএসও–এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) যৌথভাবে সেমিনারটি আয়োজন করে। সার্বিক সমন্বয়ে এডিআরআরএন, সিডব্লিউএসএ, আইসিভিএ ও ইউএন ওচা সহায়তা করে। এই সেমিনারটি হাইব্রিড ফরম্যাটে আয়োজন করা হয় এবং এতে এশিয়া প্যাসিফিকসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শতাধিক প্রতিনিধি যুক্ত হন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের যুগ্ম পরিচালক মো. ইকবাল উদ্দিন।
মূল বক্তব্যে ইকবাল উদ্দিন বলেন, ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বেআইনিভাবে কেড়ে নেওয়া হয়, যা অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়; এতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও মানবিক পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও পূর্ণ নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে মিয়ানমার জান্তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং এর জন্য জরুরি রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা রোহিঙ্গাদের জন্য উচ্চশিক্ষা, আয়ের সুযোগ, ট্রাভেল পাস, ব্যাংক হিসাব খোলার সুবিধা এবং ক্যাম্পে প্রিফ্যাব্রিকেটেড শেল্টার নির্মাণের ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন। আল্টসিয়ান-বার্মার ডেবি স্টোথার্ড বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মূল কারণগুলো দূর করতে না পারলে মর্যাদা নিশ্চিত করা যাবে না। নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া এ ক্ষেত্রে প্রথম শর্ত। এপিআরআরএনের হাফসার তামিজুদ্দিন বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নেতিবাচক বর্ণনা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কক্সবাজার এনজিও প্ল্যাটফর্মের মার্কো মিলজেভিক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন বৈশ্বিক ইস্যু; তাই এর সমাধানে দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি জরুরি। রেসিলিয়েন্ট রিফিউজি অ্যালায়ন্সের খায়ের উল্লাহ রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল ও ট্রাভেল পাসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। কানাডার রোহিঙ্গা মাইয়াফুইনর কলাবরেটিভ নেটওয়ার্কের ইয়াসমিন উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গারা ব্যর্থ হলে বৈশ্বিক মানবিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। তিনি সমালোচনার সঙ্গে বলেন, মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাড়ার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বরং বাড়ছে। এডিআরআরএন–এর তাকাশি কোমিনো বলেন, অনেক দেশ নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। টিয়ারফান্ড এশিয়ার সঞ্জীব ভাঞ্জা বলেন, রোহিঙ্গা অধিকার ও প্রত্যাবাসন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক প্রচারণা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইস্যুটিকে সক্রিয় রাখতে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বৈশ্বিক সমস্যা, এর সমাধানে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও যৌথ দায়বদ্ধতা অনিবার্য। সেমিনারের বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং মানবাধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হতে পারে।