সিএনএন : ইরানের সঙ্গে শুরু হওয়া সংঘাতের ১২ দিনের মাথায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বিজয় ঘোষণা’ করলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। স্পোর্টসের স্কোরবোর্ডের মতো যুদ্ধের জয় নির্ধারিত হয় না, বরং এক কঠিন ও অমীমাংসিত সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প এখন আধুনিক যুদ্ধের সেই পুরোনো ফাঁদে আটকে পড়েছেন, যেখানে ভাবা হয়েছিল একটি ঝটিকা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দ্রুত রাজনৈতিক বিজয় অর্জন সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র যে ভুল করেছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানও সেই একই প্রতিরোধের পথে হাঁটছে। ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চালানো এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু সংকটের সমাধান না করে উল্টো নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।
খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনির উত্থান ট্রাম্পের হিসাব উল্টে দিয়েছে। মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার বার্তা প্রচার হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, শাসনব্যবস্থায় শূন্যতা পূরণে কট্টরপন্থীরা সফল। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের শীর্ষ নেতাদের হত্যার বদলা নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ১৩ দিনের এই লড়াইয়ে ইরান প্রমাণ করেছে তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে অভ্যস্ত। মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের ড্রোন ঘাঁটি বা অবকাঠামো ধ্বংস হলেও দেশটির লড়াই করার মানসিকতা দমানো যাচ্ছে না। উল্টো বিমান হামলা সাধারণ ইরানিদের মধ্যে বিভেদ কমিয়ে শাসনের প্রতি সংহতি বাড়াচ্ছে, যা ট্রাম্পের প্রত্যাশিত গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্নকে ফিকে করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্রমাগত অস্থিরতা সৃষ্টির ফলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করছে। ট্রাম্প বারবার যুদ্ধের সমাপ্তি ও বিজয়ের কথা বললেও তার এই অতি-উৎসাহ ইরানের কাছে দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। তেহরান এখন বুঝে গেছে যে, তারা যদি কেবল টিকে থাকতে পারে এবং মাঝেমধ্যে পাল্টা আঘাত হানতে পারে, তবে সেটাই হবে তাদের জন্য নৈতিক বিজয়। এমনকি খামেনির পর দ্বিতীয় কোনো নেতাকে হত্যা করা হলেও তাতে ইরানের সংকল্প আরও কঠোর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যেমনটি আফগানিস্তানে তালেবান নেতাদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
আপাতত কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রূপ না নিলেও এই সংঘাত স্তিমিত হওয়ার পথটি হবে অত্যন্ত বন্ধুর। হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নীরব কূটনীতি বা উভয়পক্ষের ক্লান্তির ফলে যুদ্ধ থামবে, কিন্তু তাতে ইরানের কট্টরপন্থী মনোভাব আরও শক্তিশালী হবে। চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতায় ইরান পুনরায় নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং ভবিষ্যতে তারা সাইবার হামলা বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে।
ট্রাম্পের এই তড়িঘড়ি বিজয় দাবি করার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত তার জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ইরানের হার না মানার জেদই এখন সবচেয়ে বড় বাধা।