পার্স টুডে : ১৯৩৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের ভোরে, যখন সূর্য আল-জালিলের পাহাড়ের আড়াল থেকে উদিত হচ্ছিল তখন আল-বাসা গ্রাম বারুদ ও ধোঁয়ার গন্ধে ভরে উঠেছিল। ব্রিটিশ সৈন্যরা সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে একের পর এক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল, আর আগুনের শিখায় হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের জন্য মায়েদের আর্তনাদ উদাসীন ফিলিস্তিনের আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছিল।

ফিলিস্তিনের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আল-বাসা এলাকাটি ৭ সেপ্টেম্বর যেন পৃথিবীর বুকে এক নরকে পরিণত হয়। তার দুই দিন আগে সড়কে পাতা এক মাইনে দুই ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয়েছিল, আর কমান্ডাররা তাদের ঘাঁটিতে বসে এমন এক শিক্ষামূলক শাস্তি”র পরিকল্পনা করছিল, যা চিরদিন ফিলিস্তিনের স্মৃতিতে থেকে যাবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭ সেপ্টেম্বরের ভোরে একাদশ হুসার রেজিমেন্টের সাঁজোয়া যান দিগন্তে দেখা দেয়।

প্রায় বিশ মিনিট ধরে মেশিনগানের গুলিতে গ্রামের কাঁচা মাটির ঘরগুলো ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ঘুম থেকে জেগে ওঠা বাসিন্দাদের গলিতে গলিতে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু গুলির চেয়েও ভয়াবহ ছিল সেই আগুনের চুল্লিগুলো, যা নেমে আসা সৈন্যরা সঙ্গে এনেছিল। তারা দরজা ভেঙে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে নারী ও শিশুরা তখনো ঘরের ভেতরেই ছিল। গোলাবারুদের বিস্ফোরণের শব্দ মানুষের দগ্ধ হওয়ার আর্তচিৎকারের সঙ্গে মিশে যায়।

আলস্টার রেজিমেন্টের কর্মকর্তা ডেসমন্ড উডস বহু বছর পর তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, আমি কখনো সেই দিনটি ভুলব না। আমরা আল-বাসায় পৌঁছে দেখলাম সাঁজোয়া যানগুলো মেশিনগান দিয়ে গ্রামটিকে ঝাঁঝরা করছে। বিশ মিনিট ধরে তা চলল। তারপর আমরা প্রবেশ করি এবং আগুনের চুল্লি দিয়ে বাড়িগুলো জ্বালিয়ে দিই। গ্রামটি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। তবে ট্র্যাজেডি শুধু আগুনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সৈন্যরা গ্রামের প্রায় ৫০ জন পুরুষকে ঘর থেকে টেনে বের করে একটি বাসে গাদাগাদি করে তোলে। তারা বাসটিকে এমন এক সড়কে চালায়, যা মাইনমুক্ত ছিল না; মাইনের ওপর দিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বিস্ফোরিত হয়। যারা বিস্ফোরণের আগে বাস থেকে লাফিয়ে নামতে চেয়েছিল, তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। অবশিষ্ট বাসিন্দাদের অস্ত্রের মুখে দাঁড় করিয়ে লাশগুলো গণকবরে দাফন করতে বাধ্য করা হয়। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ২০ জন বলা হলেও, বেঁচে যাওয়া মানুষদের মতে সেদিন গ্রামের অর্ধেক মানুষ প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আরও চারজন জীবিত ব্যক্তিকে সামরিক শিবিরে নিয়ে গিয়ে তাদের স্বজনদের সামনে নির্যাতন করা হয়। রেজিমেন্টের কমান্ডারকে যখন জেনারেল মন্টগোমেরির সামনে তলব করা হয়, তিনি শীতলভাবে জানান যে তিনি গ্রামপ্রধানদের সতর্ক করেছিলেন—যদি তাঁর অফিসাররা নিহত হন, তবে তিনি “শাস্তিমূলক ব্যবস্থা” নেবেন। জেনারেলের জবাব ছিল: “ঠিক আছে, তবে পরের বার একটু ধীরে করবেন।

কিন্তু আল-বাসায় আর কেউ ছিল না, যে ধীরে চলার সুযোগ পেত। সেদিন গ্রামটি ছাইয়ে পরিণত হয় এবং আজ পর্যন্ত আর কখনো পুনর্গঠিত হয়নি। কোনো তদন্ত হয়নি, কোনো ক্ষমা চাওয়া হয়নি। থেকে গেছে শুধু আগুন ও ধোঁয়ার স্মৃতি—যা ব্রিটিশ সৈন্যরা এই ভূমিতে বয়ে এনেছিল।