এএফপি, দ্য গার্ডিয়ান : বিশ্বের নজর যখন ইরানের দিকে, তখন গাজায় যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ভাঙাচোরা জীবন জোড়া লাগাতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলের হামলার আগে সেখানে যে জীবনযাপন ছিল, তার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার কোনো মিল নেই। নির্বিচার বোমা হামলা ও তীব্র অবরোধের মধ্যে জীবন হয়ে উঠেছে অন্ধকার, নির্মম।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবর অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের দৃষ্টি ইরানকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় গাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠেছে আরও অনিশ্চিত ও ভীতিকর। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্লান্ত মানুষ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছে। বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে জমে থাকা কাদাপানিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে তারা।

দেইর আল-বালাহে বাস্তুচ্যুত পাঁচ সন্তানের বাবা ৫৬ বছর বয়সী আহমেদ বারউদ বলেন, ‘মাথার ওপর ড্রোনের শব্দ থামে না, প্রায় প্রতিদিনই গুলিবর্ষণ ও গোলাবর্ষণ চলে। এমনকি জেলেদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয়।’ গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পাঁচ মাস পরও বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার ভোরে খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় পুলিশ চেকপোস্টে ইসরাইলি হামলায় ছয়জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।

আহমেদ বারউদ বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে।’ গাজার মানুষের স্বপ্নও এখন বদলে গেছে। এখন শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য ভালো ফল নয়, বরং এমন আয় করা যাতে ছোট ভাইবোনদের ভিক্ষা করতে না হয়, অথবা অন্তত কয়েক লিটার বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করা যায়।

অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬৮০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে গত সপ্তাহেই নিহত হয়েছে ২৬ জন। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, অবকাঠামো ভেঙে পড়া ও বিদ্যুৎ না থাকায় অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য এখন বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ইব্রাহিম কাহিল বলেন, ‘আগে যে পানি পাওয়া যেত, এখন তা সপ্তাহে মাত্র দুই দিন আসে। সেটিও পানযোগ্য নয়, তবুও আমাদের তা পান করতে হচ্ছে। আমার মা ক্যান্সারে ভুগছেন, তাঁর ওষুধ কিনতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

গাজার চিকিৎসকরা জানান, বায়োপসি সূচের মতো মৌলিক পরীক্ষার সরঞ্জামও নেই। ফলে ক্যান্সার সন্দেহভাজন রোগীদের পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না এবং অনেকেই চিকিৎসা ছাড়াই মারা যাচ্ছেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রাফাহ ক্রসিং সীমিতভাবে চালু হওয়ার আগে গাজায় ১১ হাজারের বেশি ক্যান্সার রোগী বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় ছিলেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০ হাজারের বেশি রোগী ও আহত ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

অন্ধকার জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম গাজাবাসীর

ইসরাইলের নির্বিচার হামলার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই গাজার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পুরো অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যায়। সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার সিস্টেম থাকলেও সেগুলোর দাম যুদ্ধের সময় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। একটি সোলার প্যানেলের দাম প্রায় ৪২০ ডলার, ব্যাটারিসহ পুরো সেটআপের খরচ আরও বেশি।

ফিলিস্তিনের গাজার দেইর আল-বালাহে ভোর মানেই আবদেল করিম সালমানের জন্য নতুন এক সংগ্রামের শুরু। ২৮ বছর বয়সী এই যুবক প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই হাতে নেন নিজের ও স্ত্রীর সম্পূর্ণ চার্জহীন মোবাইল ফোন। তারপর রওনা হন কাছের কোনো একটি চার্জিং পয়েন্টের খোঁজে। রাতে তাঁর পরিবারের একমাত্র আলো আসে মোবাইল ফোনের টর্চ থেকে। দেইর আল-বালাহর একটি অস্থায়ী তাঁবুতে স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে বসবাস করা আবদেল করিম বলেন, ‘আমার ছোট বাচ্চারা অন্ধকারে ভয় পায়। তাই রাতভর ফোনের আলোই আমাদের একমাত্র ভরসা।’

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু আলো বা ফোন চার্জে সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনÑ কিছুই ব্যবহার করা যায় না। এমনকি শিশুদের দুধও দুই-তিন ঘণ্টার বেশি সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।