এপি : ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অব্যাহত হামলা এবং পাল্টা হামলার জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে ধস নেমেছে। এর ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ে রেশনিং এবং দরিদ্রদের সুরক্ষায় ভর্তুকি দিতে বাধ্য হচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শোধনাগার, পাইপলাইন, গ্যাসক্ষেত্র এবং ট্যাঙ্কার টার্মিনালগুলোতে ধারাবাহিক হামলার কারণে এই অর্থনৈতিক সংকট মাসের পর মাস, এমনকি বছরজুড়ে স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টোফার নিটেল বলেন, ‘অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো এই যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।’ গত ১৮ মার্চের হামলায় কাতারের রাস লাফান প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিশ্বের ২০ শতাংশ এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ করে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, এই হামলায় তাদের ১৭ শতাংশ রফতানি সক্ষমতা নষ্ট হয়েছে, যা মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) একে বিশ্ববাজারের ইতিহাসে ‘সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। যুদ্ধের আগে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থাকলেও গত শুক্রবার তা বেড়ে ১০৫.৩২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কারমেন রেইনহার্ট সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথের মতে, তেলের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ কমে যেতে পারে।
বিশ্বের নাইট্রোজেন সারের ৪০ শতাংশ রফতানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধাবস্থায় সারের কাঁচামাল ইউরিয়ার দাম ৫০ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে ব্রাজিল ও মিসরের মতো বড় কৃষিপ্রধান দেশগুলো সংকটে পড়েছে। সারের চড়া দামের কারণে ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন কমে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা ৮০ শতাংশ তেল ও এলএনজি এশিয়ার দেশগুলোতে যায়। ফলে এই অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সংকটের কারণে ফিলিপাইনের সরকারি অফিস সপ্তাহে চার দিন খোলা রাখা হচ্ছে এবং এসি ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভারত তাদের সীমিত এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যবসার চেয়ে সাধারণ পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেল ও গ্যাস সম্পদ থাকলেও সাধারণ ভোক্তারা সংকটে পড়েছেন। দেশটিতে এক গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম এক মাসের ব্যবধানে ২.৯৮ ডলার থেকে বেড়ে ৪ ডলারে পৌঁছেছে। দেশটিতে বেকারত্ব বাড়ছে এবং গত বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। ইওয়াই-পার্থেনন-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো জানিয়েছেন, আগামী এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এখন ৪০ শতাংশ। মুডি’স অ্যানালিটিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি এবং তার সহকর্মীরা এক মন্তব্যে বলেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতের কোনও ইতিবাচক অর্থনৈতিক দিক নেই। এখন প্রশ্ন হলো, এই শত্রুতা আর কতদিন চলবে এবং এটি অর্থনীতির আর কতটা ক্ষতি করবে।