পৃথিবী আর শুধু পানির সংকটে ভুগছে না, বরং প্রাকৃতিক সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এক ভয়াবহ ‘পানি দেউলিয়াত্বের’ বাস্তবতায় ঢুকে পড়েছে। হ্রদ শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ধ্বংস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নেমে যাওয়া এবং কোটি কোটি মানুষের নিরাপদ পানির অভাব সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে পানি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কঠিন চিত্র তুলে ধরেছে জাতিসংঘের এক নতুন প্রতিবেদন।

বার্তাসংস্থা আনাদোলু বলছে, বিশ্ব আর সাময়িক পানিসংকটে নেই; বরং ‘পানির দেউলিয়াত্বের’ যুগে প্রবেশ করেছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, প্রকৃতি বৃষ্টি ও তুষারের মাধ্যমে যে পরিমাণ পুনর্নবীকরণযোগ্য পানি সরবরাহ করে, তার তুলনায় মানুষ এখন বছরে বেশি পানি ব্যবহার করছে। জাতিসংঘ জানায়, ১৯৯০-এর দশক থেকে বিশ্বের অর্ধেক বড় হ্রদের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। এসব হ্রদের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ।

গত ৫০ বছরে প্রায় ৪১ কোটি হেক্টর প্রাকৃতিক জলাভূমি হারিয়ে গেছে, যার আয়তন প্রায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমান। মূলত বিশ্বজুড়ে গৃহস্থালি পানির প্রায় অর্ধেক আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। আবার সেচের কাজে ব্যবহৃত পানির ৪০ শতাংশের বেশি নেয়া হচ্ছে এমন ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে, যেগুলো ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের প্রধান জলাধারগুলোর ৭০ শতাংশেই দীর্ঘমেয়াদি পানির স্তর হ্রাসের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিবছর অন্তত এক মাসের জন্য প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ তীব্র পানিসংকটে ভোগে। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ এমন দেশে বাস করে, যেগুলো ‘পানি অনিরাপদ’ বা ‘চরম পানি-অনিরাপদ’ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া প্রায় ২২০ কোটি মানুষের নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই এবং ৩৫০ কোটি মানুষ নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১৮০ কোটি মানুষ খরার কবলে পড়েছিল। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর জলাভূমি ধ্বংসের ফলে পরিবেশগত সেবার ক্ষতি হয় প্রায় ৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। আর খরার কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০৭ বিলিয়ন ডলার। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (ইউএনইউ-আইএনডব্লিউইএইচ) তাদের সর্বশেষ প্রধান প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশ্ব এখন ‘বৈশ্বিক পানিদেউলিয়াত্বের’ যুগে প্রবেশ করেছে।

‘গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাংকরাপ্সি: লিভিং বিয়ন্ড আওয়ার হাইড্রোলজিক্যাল মিনস ইন দ্য পোস্ট-ক্রাইসিস ইরা’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ও ইনস্টিটিউটটির পরিচালক কাবেহ মাদানি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন আর্থিক দৃষ্টান্ত দিয়ে। আনাদোলুকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি অনেকটা সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা তোলার মতো। তার ভাষায়, ‘আমরা যদি প্রাকৃতিক আয়ের চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করতে থাকি, তাহলে আমাদের সঞ্চয়ে হাত দিতে হয়।’ মাদানি বলেন, ‘পানিদেউলিয়াত্ব’ শব্দটি শক্তিশালী হলেও এটি কোনও ফাঁপা শব্দ নয়। এটি দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা জরুরি। তার ব্যাখ্যায়, আর্থিক দেউলিয়াত্বের মতোই এটি ব্যর্থতার একটি অবস্থা যেখানে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে আর কোনও ভারসাম্য থাকে না। তিনি বলেন, ‘যেভাবে আর্থিক দেউলিয়াত্ব আমাদের কঠিন বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য করে এবং বর্তমান ব্যবসায়িক মডেল যে টেকসই নয়, তা স্বীকার করতে হয় ঠিক তেমনই পানিদেউলিয়াত্ব আমাদের সৎভাবে স্বীকার করতে বলছে যে বিশ্বের বহু জায়গায় আমাদের উন্নয়ন মডেল ও পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা টেকসই নয় এবং মৌলিকভাবে অকার্যকর।’

মাদানি বলেন, ‘সংকট’ শব্দটি সাময়িক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের বহু অঞ্চলে পানিসমস্যা এখন স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তার মতে, বিশ্ব ধীরে ধীরে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ও ভূগর্ভস্থ পানির উভয় উৎসই নিঃশেষের পথে যাচ্ছে।

মাদানি বলেন, অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির প্রাপ্য অংশও কেড়ে নিয়েছে। যদিও এই প্রকৃতি নীরব অংশীদার হিসেবে এতদিন সবকিছু বহন করে এসেছে। এর ফল হিসেবে এখন দেখা যাচ্ছে জলাভূমি আর নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারছে না, ভূগর্ভস্থ জলাধার স্বল্পমেয়াদে পুনরায় পূর্ণ হচ্ছে না, হিমবাহ সরে যাচ্ছে, প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়াসহ এমন অসংখ্য ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পানি-দেউলিয়াত্ব ধনী–গরিব নির্বিশেষে সব দেশকেই প্রভাবিত করতে পারে। বিষয়টি দেশের সম্পদের পরিমাণ নয়, বরং পানি ব্যবহারের সঙ্গে বিদ্যমান পানির বাজেটের ভারসাম্য। তার ভাষায়, ‘আর্থিক দেউলিয়াত্বের মতোইÍ আপনি ধনীও হতে পারেন, গরিবও হতে পারেন। আসল বিষয় হলো বাজেট ব্যবস্থাপনা। ধনী হয়েও দেউলিয়া হওয়া সম্ভব, আবার গরিব হয়েও দেউলিয়া না হওয়া সম্ভব।’ এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পানি-দেউলিয়াত্বের সমস্যা দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদানি বলেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো ধনী দেশগুলোর অনেকগুলোও পানি-দেউলিয়াত্ব বা এর পরিণতির মুখে পড়ছে। তবে এর ফলাফল সব জায়গায় প্রায় একই রকম। তিনি বলেন, দেউলিয়াত্ব মানেই সব শেষ নয়। এটি ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু পৃথিবীর শেষ নয়। দেউলিয়া হওয়ার স্বীকৃতি মানে ব্যর্থতা মেনে নেয়াএবং তারপর ভবিষ্যৎ গড়ার পথ খোঁজা।

মাদানি সতর্ক করে বলেন, পানি এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ, যা আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পেয়েছি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার দায়িত্বও আমাদেরই। তার কথায়, এই মূল্যবান ও অপরিহার্য সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব বিশ্বজুড়ে সরকার ও নাগরিকদের। এটি করতে ব্যর্থ হলে আমরা অস্তিত্বগত হুমকির মুখে পড়ব।