বিবিসি,আল-জাজির,বিবিসি,রয়টার্স : ভারতের হায়দরাবাদের শেষ নিজাম মীর ওসমান আলী খান ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তাঁর সংগ্রহশালায় থাকা মণিমুক্তার ভান্ডার নিয়ে প্রচলিত ছিল নানা গল্প। বলা হতো, তাঁর মণিমুক্তা রাখা হলে অলিম্পিকে যে আকারের সুইমিংপুল থাকে, তা ভরে যাবে। তো ব্রিটিশরা ভারতের রাজধানী যখন কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেন, তখন নিজের ঐশ্বর্য প্রদর্শনের এক মহাসুযোগ পেয়েছিলেন ওসমান আলী খান। দিল্লিতে যখন ব্রিটিশ-ভারতের নতুন রাজধানীর নকশা করা হচ্ছিল, তখন সেখানে রাজাশাসিত রাজ্যগুলো (প্রিন্সলি স্টেট) নিজেদের স্বকীয়তার ছাপ রাখতে চেয়েছিল। এসব রাজ্যের মহারাজারা দিল্লিতে নিজেদের প্রাসাদ তৈরি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁদের এমন আগ্রহে তৎকালীন ভাইসরয় আনন্দচিত্তে রাজি হয়েছিলেন। তাঁর মতে, মহারাজাদের এ মনোভাব নতুন রাজধানীর প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতে দুই দিনের সফরে আসা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হায়দরাবাদের শেষ নিজামের বানানো সেই প্রাসাদে থাকছেন, যা ‘হায়দরাবাদ হাউস’ নামে পরিচিত। প্রায় শতবর্ষী এ ঐতিহাসিক প্রাসাদের কিছু টুকিটাকি নিয়ে এই আয়োজন।
হায়দরাবাদ হাউস নকশায় জটিলতা: হায়দরাবাদের নিজাম নতুন রাজধানীর যেকোনো এলাকার একটি যেনতেন জমি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ভাইসরয়ের বাড়ির কাছে প্রিন্সেস পার্কের কিছু জমি, যেখানে তিনি নিজের প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। কিন্তু ব্রিটিশরা এতে রাজি হননি। ব্রিটিশরা মাত্র পাঁচজন মহারাজাকে ভাইসরয়ের বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে কিং পঞ্চম জর্জের ভাস্কর্যের আশপাশে জমি বরাদ্দ দিতে রাজি হয়েছিলেন। রাজ্যগুলো হলো হায়দরাবাদ, বরোদা, পাতিয়ালা, জয়পুর ও বিকানার। নয়াদিল্লিতে ওই সময়ে যত প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে হায়দরাবাদ হাউস ছিল সবচেয়ে বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ।
পাঁচ মহারাজার মধ্যে হায়দরাবাদের নিজাম এবং বরোদার গায়কোওয়াড় তাঁদের দিল্লির প্রাসাদের নকশা করার জন্য বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্সকে নিয়োগ দেন। ব্রিটিশ-ভারতে রাজাশাসিত রাজ্যগুলোর মধ্যে হায়দরাবাদের মর্যাদা ছিল সবচেয়ে বেশি। তাই ওসমান আলী খান ভাইসরয়ের প্রাসাদের সমান একটি বিশাল বাড়ি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই অনুমতি পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে জমি বরাদ্দের জন্য সরকার শর্ত দিয়েছিল, সব প্রাসাদের নকশার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। তাই নিজামের নির্দেশ সত্ত্বেও নিজের মতো করেই হায়দরাবাদ হাউসের নকশা করেছিলেন স্থপতি লুটিয়েন্স। ভাইসরয়ের বাড়ির নকশা থেকে নিজামের প্রাসাদের জন্য তিনি কেবল মধ্যভাগের একটি গম্বুজ নিয়েছিলেন।
প্রজাপতি আকৃতির নকশা: একটি দুর্লভ প্রজাপতির আকৃতিতে হায়দরাবাদ হাউসের নকশা করা হয়েছে। চট করে দেখলে মনে হয়, প্রাসাদটির সম্মুখভাগের ষড়্ভুজ প্রবেশপথ রাস্তার দিকে যেন তাকিয়ে আছে। প্রজাপতির ডানা দুটি পাশের রাস্তার সঙ্গে মিশে গেছে। হায়দরাবাদ হাউস কয়েক দশক ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
নয়াদিল্লিতে ওই সময়ে যত প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে হায়দরাবাদ হাউস ছিল সবচেয়ে বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ। ১৯০৩ সালে ইংল্যান্ডের লেস্টারশায়ারের পাপিলন হলের জন্য প্রজাপতি আকৃতির একটি নকশা করেছিলেন লুটিয়েন্স। সেটার আদলেই হায়দরাবাদ হাউসের নকশা করা হয়েছিল। ১৯২০-এর দশকে হায়দরাবাদ হাউস নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ লাখ পাউন্ড। মূল্যস্ফীতিকে আমলে নিলে ২০২৩ সালে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭০ কোটি রুপি।
৩৬ কক্ষের অনন্য এক প্রাসাদ: হায়দরাবাদ হাউসে মোট কক্ষের সংখ্যা ৩৬। রয়েছে একাধিক উন্মুক্ত আঙিনা, খিলান, রাজকীয় সিঁড়ি, ফায়ারপ্লেস এবং ফোয়ারা। এর অধিকাংশ তৈরি করা হয়েছে ইউরোপীয় শৈলীতে। তবে কিছু স্থাপত্যে মোগল যুগের শৈলীর ছাপ রয়েছে। লুটিয়েন্স ভাইসরয়ের প্রাসাদসহ ভারতের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের নকশা করেছিলেন। তাঁর নকশায় ভবনের আকৃতির সঙ্গে অলংকারের ব্যবহারের মধ্যে সামঞ্জস্য দেখা যায়। প্রবেশপথের ওপরে থাকা গম্বুজ হায়দরাবাদ হাউসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ প্রাসাদ ইন্ডিয়া গেটের কাছে ৮ দশমিক ২ একর জমিতে বিস্তৃত।
প্রবেশপথের ওপরে থাকা গম্বুজ হায়দরাবাদ হাউসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ প্রাসাদ ইন্ডিয়া গেটের কাছে ৮ দশমিক ২ একর জমিতে বিস্তৃত। প্রাসাদের বৃত্তাকার খিলান ও আয়তাকার ফাঁকা স্থানের সমন্বয়ে গঠিত বিস্তৃত ধনুক আকৃতির স্থাপত্য শৈলী ইতালির রোমের প্যান্থিয়ন মন্দির থেকে অনুপ্রাণিত। প্রথম তলার জানালার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে আয়তাকার ও বৃত্তাকার শৈলী। লুটিয়েন্স এ নকশা ইতালির ফ্লোরেন্সে অবস্থিত উফিজি গ্যালারির আরনো নদীর পাশে থাকা স্থাপত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি করেছেন। ১৯০৯ সালে তিনি রোমে ছিলেন।
এ প্রাসাদে যাঁরা থেকেছেন: হায়দরাবাদ হাউস কয়েক দশক ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এতে নানা সময়ে বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, গর্ডন ব্রাউন থেকেছেন। পুতিন এর আগে ভারত সফরে এসেও এ প্রাসাদে থেকেছেন। বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিরা এ প্রাসাদে থাকার পাশাপাশি সেখানে রাষ্ট্রীয় ভোজ, বৈঠক এবং যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে থাকেন। হায়দরাবাদ হাউস নয়াদিল্লির ১ নম্বর অশোক রোডে অবস্থিত। কৌশলগত কারণে এর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। এর অদূরে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয় এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ (ভিভিআইপি) বৈঠক ও সভা আয়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ভালোয় ভালোয় সরে না গেলে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও দনবাস অঞ্চল দখল করবে রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার পন্থা নিয়েও কোনো সমঝোতা করার বিষয় বাতিল করে দিয়েছেন তিনি। দুদিনের ভারত সফর শুরুর আগে গত বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পুতিন এ হুঁশিয়ারি দেন। পুতিন বলেন, ‘ইউক্রেনের সেনারা হয় এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাবে, নয় আমরা সামরিকভাবে বা অন্য কোনো উপায়ে এ অঞ্চলকে মুক্ত করব।’ ইউক্রেনের পূর্বাংশের দনবাস অঞ্চলের প্রায় ৮৫ শতাংশ এখন মস্কোর দখলে রয়েছে। ইউক্রেন বলেছে, মস্কো ইউক্রেনের যেসব অঞ্চলে যুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছে, তারা সেগুলো তাকে দিতে চায় না। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কোনো অঞ্চলগত ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন। জেলেনস্কি বলেছেন, যুদ্ধ রাশিয়া শুরু করেছিল। এ জন্য মস্কোকে কোনো পুরস্কার দেওয়া উচিত নয়। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ১৯ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে ক্রিমিয়াও রয়েছে। ২০১৪ সালে এটি দখল করে নেয় রাশিয়া। এ ছাড়া গোটা লুহানস্ক, দোনেৎস্কের ৮০ শতাংশ, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়ার প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। খারকিভ, সুমি, মাইকোলাইভ ও নিপ্রোপ্রোভস্ক অঞ্চলের ছোট কিছু অংশও তাদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে দোনেৎস্কের প্রায় ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে একটি শান্তিচুক্তির উদ্যোগ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে গত মঙ্গলবার মস্কোয় বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা।
এ ছাড়া মস্কোয় থাকা ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফের ফ্লোরিডায় ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল। মস্কোয় অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছেন, তাঁর প্রতিনিধিরা বিশ্বাস করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ‘যুদ্ধ শেষ করতে চান’।
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের পর নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন পুতিন। এদিকে ওই বৈঠকের বিষয়ে আজ শুক্রবার ক্রেমলিন বলেছে, রাশিয়ায় বৈঠকের পর মস্কো এখন ওয়াশিংটনের সাড়ার অপেক্ষায় আছে। যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনার মূল প্রস্তাবে দনবাসের যেসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখনো ইউক্রেনের হাতে আছে তা কার্যত পুতিনের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা ছিল। কিন্তু উইটকফের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল মস্কোয় ওই প্রস্তাবের একটি সংশোধিত সংস্করণ উপস্থাপন করেছে।
বর্তমানে ভারত সফরে আছেন পুতিন। ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুতিন আরও বলেন, উইটকফ ও ট্রাম্পের মেয়ের জামাই জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে আলোচনার আগে তিনি নতুন সংস্করণটি দেখেননি। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার কয়েকটি অংশের সঙ্গে মস্কো একমত হতে পারেনি বলেও জানান পুতিন। তবে কোন কোন অংশ নিয়ে মস্কোর আপত্তি সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি।