বিবিসি : জাপানে গত একবছরে ১৮ হাজারের বেশি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর হারিয়ে যান। পরে তাদের প্রায় ৫০০ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, ২০১২ সালের পর থেকে এ ধরনের ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে ক্রমে কমছে শ্রমশক্তি। এদিকে, বিদেশি কর্মী নিয়োগে কঠোর সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ডিমেনশিয়াকে অন্যতম জরুরি নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে দেশটির সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, ডিমেনশিয়ার চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যয় ২০২৫ সালে প্রায় নয় ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা দশকের শেষ নাগাদ ১৪ ট্রিলিয়নে ঠেকতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানে বেশি জোর দিচ্ছে সরকার। হারিয়ে যাওয়া প্রবীণদের খুঁজে পেতে জিপিএস-ভিত্তিক ডিভাইস ব্যবহার শুরু করেছে অনেক পরিবার। দেহে বা জামায় সাঁটানো যায়, এমন কিছু জিপিএস ট্যাগ রয়েছে, যা ওই ব্যক্তি নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়লেই দ্রুত কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। আবার অনেক শহরে কমিউনিটিভিত্তিক নিরাপত্তা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে দোকানের কর্মীরা রিয়েল টাইম নোটিফিকেশন পান। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিখোঁজ প্রবীণদের পাওয়া যায়।
রোবট ও এআই সহায়তা: প্রাথমিক পর্যায়ে ডিমেনশিয়া শনাক্ত করতেও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। ফুজিৎসুর ‘এআই গেইট’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হাঁটার ভঙ্গি, নড়াচড়া ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করতে পারে। ধীরে হাঁটা, ঘুরতে সমস্যা বা দাঁড়ানোর সময় দেরি করা ইত্যাদি তথ্য পরে চিকিৎসকেরা নিয়মিত চেক-আপে ব্যবহার করেন। ফুজিৎসুর মুখপাত্র হিদেনরি ফুজিওয়ারা বলেন, বয়সজনিত রোগ দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডাক্তাররা যদি মোশন-ক্যাপচার ডাটা পান, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এদিকে, ভবিষ্যতে প্রবীণদের পরিচর্যার কাজে ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা তৈরি করছেন এয়ারেক, ১৫০ কেজি ওজনের এক মানবাকৃতির রোবট। এটি মোজা পরাতে, ডিম ভাজতে কিংবা কাপড় গোছাতে সাহায্য করতে পারে। গবেষকদের আশা, পরবর্তী ধাপে এটি ডায়াপার বদলানোর মতো কাজও করতে পারবে। জাপানের অনেক সেবাকেন্দ্রে ইতোমধ্যেই রোবট ব্যবহার হচ্ছে। এগুলো মানুষকে সঙ্গ দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গান শোনানো বা হালকা ব্যায়াম করানোর কাজও করছে। রাতের বেলা রোবট-ভিত্তিক সেন্সর গদির নিচে রাখা হয়, যা রোগীদের ঘুম ও শারীরিক অবস্থার হিসাব রাখে এবং মানবকর্মীর ওপর চাপ কমায়। সহকারী অধ্যাপক তামন মিয়াকে বলেন, মানবসদৃশ রোবট নিরাপদে মানুষের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রয়োজন উচ্চমাত্রার সেন্সিং ও অভিযোজন ক্ষমতা। এতে আরও কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহায়তার রোবট?: আবেগ সামলাতেও রোবট তৈরি হচ্ছে। পোকেতোমো নামের ১২ সেমি আকারের একটি রোবট ব্যাগ বা পকেটে রাখা যায়। এটি ব্যবহারকারীকে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়, আবহাওয়া অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে বলে এবং নিঃসঙ্গ মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে সহায়তা করে। শার্প-এর উন্নয়ন ব্যবস্থাপক মিহো কাগেই বলেছেন, আমরা সামাজিক সমস্যা সমাধানে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাই। তবে গবেষকেরা বলছেন, যান্ত্রিক সহায়তা মানবিক সংযোগের বিকল্প হতে পারে না। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিয়াকে বলেন, রোবট মানবসেবকদের পরিপূরক হবে, বিকল্প নয়। কিছু কাজ গ্রহণ করলেও মূল লক্ষ্য হবে পরিচর্যাকারী ও রোগী উভয়কে সহায়তা করা।
ভুল অর্ডার নেওয়ার রেস্তোরাঁ: টোকিওর সেনগাওয়ায় আতিকো কাননা চালু করেছেন ‘রেস্টুরেন্ট অব মিসটেকেন অর্ডার্স’ (ভুল অর্ডারের রেস্তোরাঁ), যেখানে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অর্ডার নেন। নিজের বাবাকে দেখে তিনি এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা মানুষের মাঝে থাকতে পারবেন। ক্যাফের একজন পরিবেশক তোশিও মোরিতা একেক টেবিলের অর্ডার মনে রাখার জন্য ফুল ব্যবহার করেন। তার মানসিক দুর্বলতা দিনে দিনে বাড়লেও, অতিথিদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করেন তিনি।