রয়টার্স,বিবিসি : ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডকে নতুন করে গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিকল্পনার নাম দেয়া হয়েছে ‘নিউ গাজা’। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডটিকে একেবারে নতুনভাবে পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে এতে। ‘নিউ গাজা’ নিয়ে উপস্থাপিত স্লাইডে দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরের তীরজুড়ে সারি সারি উঁচু ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাফাহ এলাকায় থাকবে আবাসিক প্রকল্প।
একটি মানচিত্রে দেখানো হয়, গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষের জন্য ধাপে ধাপে নতুন আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি ও শিল্পাঞ্চল তৈরি করা হবে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সেখানেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বোর্ড অব পিসের ঘোষণা দেয়া হয়। এই বোর্ডের দায়িত্ব হবে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা। ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘আমরা গাজায় সফল হতে যাচ্ছি। এটা দেখার মতো জিনিস হতে যাচ্ছে। মনে-প্রাণে আমি একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং এটি পুরোপুরি জায়গার খেলা। সমুদ্রের ধারের এই জায়গাটি দেখুন। এই অসাধারণ ভূখণ্ডটি দেখুন। অনেক মানুষের জন্য এটি অনেক বড় কিছু হয়ে উঠতে পারে।’
ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির আলোচনায় তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, গাজায় প্রায় ৯০ হাজার টন গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেখানে প্রায় ছয় কোটি টন ধ্বংসস্তূপ জমে আছে, যা পরিষ্কার করতে হবে। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শুরুতে তারা ভাবছিলেন একটি মুক্ত এলাকা করা হবে এবং আরেকটি থাকবে হামাসের জন্য। পরে তারা ভাবলেন, পুরোটাই একসাথে করা হবে। কুশনার বলেন, ‘হামাস নিরস্ত্রীকরণের চুক্তিতে সই করেছে এবং সেটি বাস্তবায়ন করা হবে’। তার ভাষায়, ‘মানুষ আমাদের কাছে প্ল্যান বি জানতে চায়? এর কোনও প্ল্যান বি নেই।’ যুক্তরাষ্ট্রের মাস্টার প্ল্যানে গাজায় উপকূলীয় পর্যটন এলাকা দেখানো হয়েছে, যেখানে প্রায় ১৮০টি উঁচু ভবন থাকবে। পাশাপাশি থাকবে আবাসিক এলাকা, শিল্প অঞ্চল, তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র, আধুনিক কারখানা, পার্ক, কৃষিজমি ও খেলাধুলার সুবিধা।
মিসর সীমান্তের কাছে একটি নতুন সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে এতে। পাশাপাশি, সেখানে এমন একটি বিশেষ সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে মিসর ও ইসরায়েলের সীমান্ত মিলিত হয়েছে। গাজা পুনর্গঠনের কাজ চারটি ধাপে করা হবে। প্রথমে রাফাহ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে গাজা শহরের দিকে অগ্রসর হওয়া থাকবে।
মানচিত্রে মিসর ও ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর একটি খালি ভূখণ্ড দেখানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনায় উল্লেখ করা নিরাপত্তা এলাকা, যেখানে গাজা পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করবে। আরেকটি স্লাইডে বলা হয়, নিউ রাফাহ এলাকায় এক লাখের বেশি স্থায়ী ঘর, ২০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৭৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করা হবে। যুদ্ধের আগে গাজার দক্ষিণের এই শহরে প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার মানুষ বসবাস করতো। কিন্তু ইসরায়েলি হামলা ও পরিকল্পিত ধ্বংসের ফলে শহরটি প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং এখন এটি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন। কুশনার বলেন, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই নিউ রাফাহ নির্মাণ শেষ করা সম্ভব। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ‘নিউ গাজা হতে পারে আশার প্রতীক, একটি নতুন গন্তব্য এবং শিল্পনির্ভর একটি এলাকা’। তিনি আরও বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি সম্মেলন হবে। সেখানে বিভিন্ন দেশ তাদের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেবে এবং বেসরকারি খাতের জন্য বড় বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হবে বলে জানান কুশনার।
কুশনার আরও বলেন, গাজাকে নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া এখন থেকেই শুরু হচ্ছে। তিনি বিশেষভাবে বলেন, নিরাপত্তা না থাকলে কেউই সেখানে বিনিয়োগ করবে না। তার ভাষায়, ‘গাজার নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ফিলিস্তিনি প্রশাসন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) এই নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় হামাসের সঙ্গে কাজ করবে, যাতে চুক্তিতে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করে পরের ধাপে নেয়া যায়’। হামাস বরাবরই জানিয়ে এসেছে, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে না। তবে ট্রাম্প হামাসকে সতর্ক করে বলেন, ‘হামাসকে অস্ত্র ছাড়তেই হবে। যদি তারা তা না করে, তাহলে সেটাই হবে তাদের শেষ।’
‘নিউ গাজা’ নামের এই পরিকল্পনায় ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে ডজন ডজন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, আধুনিক আবাসন প্রকল্প এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ার কথা বলা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নবগঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এই মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করা হয়। দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধ এবং পুনর্গঠন তদারকির জন্য এই বোর্ড গঠন করেছেন ট্রাম্প।
পরিকল্পনাটি তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, গাজায় আমরা সফল হতে যাচ্ছি। এটা হবে দেখার মতো চমৎকার একটি বিষয়। আমি হৃদয়ে একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, আর ব্যবসার মূল বিষয় হলো এর অবস্থান (লোকেশন)। আমি বলেছি, সমুদ্রের ধারের এই সুন্দর জায়গাটি দেখুন। কত মানুষের জন্য এটি কী হতে পারে, ভেবে দেখুন।
কী আছে এই মাস্টারপ্ল্যানে?: যুক্তরাষ্ট্রের এই মাস্টারপ্ল্যানে গাজার ২১ লাখ জনসংখ্যার জন্য আবাসিক, কৃষি ও শিল্প এলাকা গড়ে তোলার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। ‘কোস্টাল ট্যুরিজম’ বা উপকূলীয় পর্যটন জোনের জন্য ১৮০টি সুউচ্চ টাওয়ার ব্লক রাখা হয়েছে। এছাড়া থাকবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স, ডাটা সেন্টার, উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট এবং বিশাল সব পার্ক ও খেলার মাঠ। মিসর সীমান্তের কাছে একটি নতুন সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত। মিসর ও ইসরায়েল সীমান্তের সংযোগস্থলে একটি ত্রিপক্ষীয় ক্রসিং স্থাপন করা হবে। পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যা রাফাহ থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে গাজা শহরের উত্তর দিকে অগ্রসর হবে।
পরিকল্পনায় ‘নিউ রাফাহ’ নামের অংশে ১ লাখের বেশি স্থায়ী ঘরবাড়ি, ২০০টি শিক্ষাকেন্দ্র এবং ৭৫টি চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরির কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার জানান, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ‘নিউ রাফাহ’র নির্মাণ কাজ শেষ করা সম্ভব।
নিরাপত্তা ও নিরস্ত্রীকরণ: ম্যাপে দেখা গেছে, মিসর ও ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর একটি খালি ভূখণ্ড রাখা হয়েছে। এটি ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ‘সিকিউরিটি পেরিমিটার’ বা নিরাপত্তা বেষ্টনী, যেখানে গাজা পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করবে।
জ্যারেড কুশনার বলেন, “গাজায় ৯ কোটি কেজি গোলাবারুদ ফেলা হয়েছে এবং ৬০ মিলিয়ন টন ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে হবে। হামাস নিরস্ত্রীকরণের চুক্তিতে সই করেছে এবং আমরা সেটিই কার্যকর করব। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কেউ বিনিয়োগ করবে না।” হামাসকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, “তাদের অবশ্যই অস্ত্র ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে তাদের শেষ দেখে ছাড়া হবে।” এছাড়া গাজায় থাকা শেষ ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়েও জোর দিয়েছেন তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া: অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত তিন মাসে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের পর্যাপ্ত আশ্রয় নেই এবং ১৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছেন। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ট্রাম্পের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, “আসল পরীক্ষা হবে হামাস গাজা ছাড়লে।” অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস শান্তি পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন ও ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে গাজার নবগঠিত টেকনোক্র্যাট সরকার ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর প্রধান আলী শাথ ঘোষণা করেছেন, আগামী সপ্তাহে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়া হবে। যা ২০২৪ সালের মে মাস থেকে বন্ধ ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৫৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।