আল-জাজিরা : দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় চীনের পররাষ্ট্রনীতি এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাতিন আমেরিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক থেকে আর্কটিক সার্কেল পর্যন্ত—বেইজিং সতর্ক বাস্তববাদ এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রভাবকেন্দ্র পুনর্গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নতুন করে দেখা দেওয়া আঞ্চলিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সম্প্রসারণমূলক লক্ষ্যগুলো চীনের নীতিকে প্রভাবিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্র: প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা
চীনের সরকারি বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ‘শান্তিপূর্ণ উত্থান’, ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’, ‘সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান’ এবং পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ধারণা। বেইজিং জোর দিয়ে বলে যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক যেন সংঘাতে রূপ না নেয় এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা যেন সংঘাত নয়, সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
তবে বাস্তব ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এই বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের ফলে আবারও কড়া বক্তব্য ও ভূরাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মতো সাম্প্রতিক মার্কিন পদক্ষেপগুলো চীনের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বেইজিং এগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘনকারী আধিপত্যবাদী প্রবণতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে।
এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে চীনের কৌশল সরকারি বক্তব্যের বাইরে গিয়ে সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের প্রতিফলন ঘটায়। বাস্তবে, বেইজিং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি—বিশেষত ট্রান্সআটলান্টিক টানাপোড়েন—ব্যবহার করে ঐতিহ্যগত জোটগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
চীন ট্রাম্প প্রশাসনের অনিয়মিত আচরণকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থার ফাটল বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে। নিজেকে একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে বেইজিং ইউরোপীয় অংশীদারদের ওয়াশিংটনের ওপর তাদের ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে উৎসাহিত করতে চায়। এর মাধ্যমে ইউরোপের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর ধারণাকে জোরদার করে ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তা সংযোগ দুর্বল করা এবং চীনের দীর্ঘমেয়াদি নীতির বিরুদ্ধে ঐক্য কমিয়ে আনা তার লক্ষ্য।
ইরান ও সিরিয়া: চীনের কৌশলগত হিসাব
ইরান ও সিরিয়ার মতো আঞ্চলিক সংকটে চীনের নীতি অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সূক্ষ্ম সমন্বয়ে গঠিত। বেইজিং তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতাকে কেবল বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখে না; বরং এটি তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ বৈচিত্র্যের বৃহত্তর কৌশলের একটি স্তম্ভ।
চীন বিশেষভাবে ইরানের মধ্য দিয়ে ইউরেশিয়ার দিকে স্থলভিত্তিক করিডোর উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব করিডোর হরমুজ প্রণালি, মালাক্কা প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশলগত বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।
সিরিয়ার ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান সরাসরি হস্তক্ষেপের বদলে রাজনৈতিক সমাধান ও পুনর্গঠনের ওপর কেন্দ্রীভূত। এটি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বারবার ঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—‘সিরিয়ানদের দ্বারাই পরিচালিত রাজনৈতিক সমাধান’ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা।
অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে চীন ব্যয়বহুল সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গড়ে তুলছে।
এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কেও স্পষ্ট, যেখানে বেইজিং নিজেকে বাণিজ্য, অবকাঠামো বিনিয়োগ, কূটনীতি ও সংস্কৃতিনির্ভর বিকল্প উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করছে—পশ্চিমা নিরাপত্তা উপস্থিতি বা রাজনৈতিক চাপের বিপরীতে। যদিও এসব অংশীদারিত্ব পারস্পরিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তৈরি করছে, তবু ওয়াশিংটন ও অন্যান্য পশ্চিমা রাজধানীতে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব গড়ে তুলে ঐতিহ্যগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা।
ভূরাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে অর্থনীতি
‘শান্তিপূর্ণ উত্থান’-এর সরকারি বয়ান সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় চীনের বাস্তব চর্চাকে অনেকেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গোপন মঞ্চ হিসেবে দেখেন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ও শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদ্ধতিগত সম্প্রসারণ একটি বিকল্প বৈশ্বিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার সুস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে, যা ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন নিয়ম ও কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
সমালোচকদের মতে, ‘সমন্বিত উন্নয়ন’-এর ব্যানারে দেওয়া বিপুল চীনা বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নির্ভরতার ধারা তৈরি করে এবং গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তি স্থাপন করে।
আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত চীন পশ্চিমা মডেলের বিকল্প উন্নয়ন কাঠামো উপস্থাপন করতে সফল হয়েছে—যেখানে রাজনৈতিক সংস্কারের শর্ত নেই। এর মাধ্যমে বেইজিং ধীরে ধীরে আঞ্চলিক গতিশীলতা প্রভাবিত করতে পারছে।
তবে আর্কটিকের মতো উচ্চ ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীল পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে চীনের সরাসরি প্রভাব এখনো সীমিত। গ্রিনল্যান্ডে চীনের সম্প্রসারণমূলক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিছু পশ্চিমা বর্ণনা অতিরঞ্জিত হলেও বাস্তবে সেখানে চীনের উপস্থিতি এখনো সীমিত ও মূলত অনুসন্ধানমূলক। স্থানীয় শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঐতিহ্যগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের রাজনৈতিক বাধার কারণে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে নির্ণায়ক কৌশলগত প্রভাবে রূপ দেওয়া বেইজিংয়ের জন্য কঠিন।
বহুমেরু বিশ্বে চীনের পররাষ্ট্রনীতি
২০২৬ সালে চীনের পররাষ্ট্রনীতি এক ধরনের কৌশলগত বৈপরীত্য দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে: একদিকে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে সম্প্রসারণবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত না হয়েই বৈশ্বিক শাসনের নিয়ম প্রভাবিত করা। সম্ভব হলে কঠোর শক্তির পরিবর্তে নরম অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহারের প্রবণতাও এতে স্পষ্ট।
কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে—যেখানে ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই প্রতিক্রিয়াশীল নীতি গ্রহণ করছে, ভেনেজুয়েলা থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সংকট তীব্র হচ্ছে, এবং আর্কটিকের মতো অঞ্চলগুলো কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি অংশীদারিত্ব থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা কূটনীতি পর্যন্ত চীনের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে আলাদা পদক্ষেপ নয়, বরং পশ্চিমা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রভাব ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার নেটওয়ার্ক নতুনভাবে আঁকার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জোটের রূপ বদলাতে থাকলে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য স্থানান্তরিত হলে চীনা কূটনীতি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হবে। মূল প্রশ্নটি রয়ে যায়: বেইজিংয়ের উত্থান কি আরও বহুমাত্রিক ও সহযোগিতামূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থার পথ খুলে দিচ্ছে, নাকি এটি তীব্র প্রতিযোগিতামূলক গতিশীলতা উসকে দিচ্ছে, অথবা একেবারে নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক মডেল তৈরি করছে? এর উত্তর দেওয়ার জন্য এখনো সময় আসেনি।