- যুক্তরাষ্ট্রের রণতরিকে সহায়তা করা
- যেকোনো কেন্দ্র হামলার নিশানা চীনের দ্বারস্থ ট্রাম্প
- হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ জাহাজ পাঠাতে অনীহা অনেক দেশের
পারস্য উপসাগরে ঢোকার সাহস নেই যুক্তরাষ্ট্রের। আইআরজিসি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, যুদ্ধ শেষের পথ খুঁজছে তারা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে সহায়তা করা যেকোনো কেন্দ্র ইরানের হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। এছাড়া হরমুজ প্রণালী আবার চালু করতে চীনের দ্বারস্থ হয়েছে আগ্রাসী ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। এর বাইরে অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য কয়েকটি দেশ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না বলে জানিয়েছে। ইসরাইল এই যুদ্ধ আরো কয়েক সপ্তাহ চলবে বলে জানিয়েছে। আল-জাজিরা, গার্ডিয়ান, প্রেস টিভি, এএফপি, রয়টার্স, টেলিগ্রাফ, তাসনিম নিউজ এজেন্সি, এপি।
‘পারস্য উপসাগরে ঢোকার সাহস নেই যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলী লক্ষ্যবস্তুতে এখন পর্যন্ত যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করা হয়েছে তার অধিকাংশই প্রায় এক দশক আগে তৈরি করা হয়েছিল। আরও আধুনিক অস্ত্র এখনো মজুত রয়েছে। এখন পারস্য উপসাগরে ঢোকার সাহস নেই যুক্তরাষ্ট্রের, যুদ্ধ শেষের পথ খুঁজছে তারা।
আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাইনি ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নিস্ট’ লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় ৭০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩,৬০০টি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই সামরিক অভিযানটির নাম দেওয়া হয়েছে অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪।
নাঈনি বলেন, ‘বর্তমানে যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো প্রায় এক দশক আগের। গত ১২ দিনের যুদ্ধ থেকে রমজানের যুদ্ধ পর্যন্ত যে অনেক উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়েছে, সেগুলো এখনো ব্যবহার করা হয়নি।’
ওয়াশিংটনের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে আইআরজিসির এই মুখপাত্র বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরের কাছে আসার সাহস পাচ্ছে না এবং হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, যদি শত্রুপক্ষ দাবি করে যে তারা আমাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করেছে, তাহলে তারা সাহস করে তাদের যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরে নিয়ে আসুক।
নাঈনির দাবি, আইআরজিসি নৌবাহিনী ও ইরানের সেনাবাহিনীর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ওমান উপসাগরের শেষ প্রান্তে ৩০০ থেকে ৪০০ মাইল দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
তার মতে, এসব জাহাজ উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং মেরামতের জন্য এলাকা ছেড়ে যেতে হয়েছে, ফলে তারা আর সামরিক অভিযানে অংশ নিতে পারছে না।
তিনি আরও দাবি করেন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের রাডার, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদ ডিপো এবং যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
শত্রুদের ইরানের পতনের হিসাব ভুল ছিল
নাঈনি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটি ভেঙে পড়বে এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেছিল।
তার দাবি, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেছিল যে নেতার মৃত্যু হলে ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শাসনব্যবস্থায় দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, ১৫ দিন পর দেখা যাচ্ছে শত্রুপক্ষই এখন সন্দেহ, হতাশা ও বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।
যুদ্ধ শেষের পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র
আইআরজিসির মুখপাত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখন কার্যত তাদের ব্যর্থতা স্বীকার করেছে এবং কীভাবে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে যুদ্ধ শেষ করা যায় তা নিয়ে ভাবছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে প্রস্তুত। কিন্তু এখন যুদ্ধের নেপথ্যের শক্তিগুলোর ভাষা বদলে গেছে।
নাঈনির মতে, শত্রুপক্ষ এখন ইরানের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করে সংঘাতের ইতি টানা যায় তা নিয়েই আলোচনা করছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান আক্রমণকারীদের শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত হামলা চালিয়ে যাবে এবং শত্রুপক্ষ যখন ইরানের সামরিক ও সামাজিক প্রতিরোধ ক্ষমতা মেনে নেবে, তখনই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রণতরিকে সহায়তা করা যেকোনো কেন্দ্র হামলার নিশানা হবে
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে সহায়তা করা যেকোনো কেন্দ্র ইরানের হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়ার কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র গতকাল রোববার এই হুমকি দেন। তিনি বলেন, লোহিত সাগরে ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডের উপস্থিতি ইরানের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
এই মুখপাত্র বলেন, লোহিত সাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরিটিকে যেসব কেন্দ্র লজিস্টিকসহ অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে, সেগুলো ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
খাতাম আল-আম্বিয়ার কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর হলো ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের অধীন একটি শাখা। এর দায়িত্ব বিভিন্ন ইরানি সামরিক ইউনিটকে নিয়ে পরিচালিত অভিযানের পরিকল্পনা ও সমন্বয় করা।
হরমুজ প্রণালী আবার চালু করতে এবার চীনের দ্বারস্থ ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে আগ্রাসনের জেরে তেহরানের বন্ধ করে দেওয়া হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে মিত্রদেশগুলোর পাশাপাশি চীনের দ্বরস্থ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনসহ মিত্রদেশ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে এই নৌপথ সুরক্ষিত করতে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া আজ সোমবার জানিয়ে দিয়েছে, এই নৌপথে জাহাজ পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
চীন অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানের জবাবে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বড় জ্বালানিকেন্দ্রে ইরানের হামলা শিল্প খাতে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
হরমুজ প্রণলীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর, অন্যদেরও অনীহা
বৃটেন এবং অন্যান্য মিত্র দেশ ট্রাম্পের ‘সম্মিলিত উদ্যোগ’-এর আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে গতকাল সোমবার শেয়ারবাজারে আরও অস্থিরতার আশঙ্কা করা হয়। বৃটিশ জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেন, সরকার হরমুজ প্রণলী পুনরায় খোলার জন্য কী করা যেতে পারে তা গভীরভাবে বিবেচনা করছে। তবে তিনি কোনো দৃঢ় অঙ্গীকার দিতে অস্বীকৃতি জানান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়া ঠেকাতে হরমুজ প্রণলী পুনরায় খুলতে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা চাইলেও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ফ্রান্স রোববার ট্রাম্পের অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ফ্রান্সের অবস্থান প্রতিরক্ষামূলক ও সুরক্ষামূলক থাকবে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না। দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে তারা পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, আর জার্মানিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌমিশন হরমুজ প্রণলী পর্যন্ত বাড়ানোর ধারণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
হরমুজ প্রণলীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না অস্ট্রেলিয়া
ইরানের অব্যাহত হামলার মুখে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণলীতে কোনও যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না অস্ট্রেলিয়া। সোমবার দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণলী সচল রাখতে তিনি প্রায় সাতটি দেশের কাছে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে এই আহ্বান জানান তিনি।
তবে সোমবার অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে (এবিসি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পরিবহনমন্ত্রী ক্যাথরিন কিং বলেন, এ ধরনের কোনও অনুরোধের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমরা হরমুজ প্রণলীতে কোনও জাহাজ পাঠাচ্ছি না। আমরা জানি এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এ ধরনের কোনও অনুরোধ আমাদের কাছে আসেনি এবং আমরা এতে অংশ নিচ্ছি না।
অস্ট্রেলিয়া গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইরানি হামলা থেকে রক্ষায় একটি বিমান বাহিনীর নজরদারি উড়োজাহাজ এবং আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার কথা জানিয়েছিল। তবে সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া ইরানের বিরুদ্ধে কোনও ‘আক্রমণাত্মক পদক্ষেপে’ অংশ নিচ্ছে না।
যুদ্ধ খুব সম্ভবত আরও কয়েক সপ্তাহ চলবে
ইসরাইলের সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহার বলেছেন, চলমান যুদ্ধে আগামী কয়েক দিনে উত্তেজনা বাড়তে পারে। সে জন্য তাঁর দেশকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ খুব সম্ভবত আরও কয়েক সপ্তাহ চলবে।
ইসরাইলের রেডিও ১০৩ এফএমকে এসব কথা বলেন মিকি জোহার। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, আগামী কয়েক দিনে উত্তেজনা বাড়তে পারে। ইসরাইলের পুরো রাষ্ট্র, আমাদের সবাইকে আগামী কয়েক দিনের জন্য আরও প্রস্তুত থাকতে হবে। যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ চলার সম্ভাবনা খুব বেশি।’