এএফপি : প্রথমত, ইরানের সমুদ্রসীমায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এই করিডর বর্তমানে কার্যত বন্ধ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বিপদে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা এই প্রণালি ব্যবহার করে গ্যাস-তেল রপ্তানি করে থাকে। কাতার ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তির মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের যে অঙ্গীকার তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করেছে, তা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। একই কারণে সৌদি আরব তাদের তেল উৎপাদন কমিয়ে এনেছে। এসব কারণে তেলের দাম আগামীতে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, তেল রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত হয়ে এলে চীন, ভারত, জাপানসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মন্দাবস্থার মুখে পড়বে। এসব দেশ তাদের জ্বালানি প্রয়োজন মেটায় আমদানি করে। এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়বে উৎপাদন খাত ও কৃষি। দেখা দেবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, এমনকি বিপ্লব। তৃতীয়ত, তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভর করে উপসাগরের দেশগুলো তাদের বিশাল জাতীয় সম্পদ তহবিল গড়ে তুলেছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় চার লাখ কোটি ডলার। তেল-গ্যাসই যদি রপ্তানি না করা যায়, তাহলে আংশিক হলেও এই জাতীয় তহবিল লিকুইডেট বা গুটিয়ে ফেলতে হতে পারে। চতুর্থত, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল হিসাব করে বলছে, উপসাগরের চার দেশের জাতীয় সম্পদ তহবিল বিনিয়োগের প্রায় দুই লাখ কোটি ডলার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই তহবিল গুটিয়ে নিলে সেটাও ধাক্কা খাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ধস নামতে পারে পুঁজি বাজারে। বাণিজ্য শুল্কের কারণে এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, মানুষের দৈনন্দিন ক্রয়ক্ষমতাও কমে আসছে। এসবের প্রভাব যে এ বছর নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পড়বে, তা একরকম নিশ্চিত।

সত্তর দশকের পুনরাবৃত্তি: ইরান যুদ্ধ নিয়ে যে অর্থনৈতিক সংকট, তা আমাদের সত্তরের দশকের আরব-ইসরাইল যুদ্ধকালীন সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো ‘তৈল অবরোধ’ঘোষণা করায় জ্বালানি তেলের দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি সারা বিশ্বকে গ্রাস করে।

এ রকম অবস্থাকেই অর্থনীতিবিদেরা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতি নামে অভিহত করে থাকেন। অনেকেই বলছেন, বিশ্ব আবার সেই পথেই হাঁটছে। সত্তর দশকের সেই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতি তাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বহিঃসম্পর্ক পুনর্গঠন করলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা মোটেই কমাতে পারেনি। এই সংকট শুধু জ্বালানি তেলের উৎপাদন ও রপ্তানির কারণে নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক পেশিশক্তি এখন বিশ্বের অর্থনীতির প্রধান ধমনি। বিশ্বের প্রতিটি প্রধান বাজারে রয়েছে তাদের বিনিয়োগ। তাতেই যদি আঘাত পড়ে, ছোট–বড় কেউ-ই রেহাই পাবে না।

এ কথা অজানা নয় যে উপসাগরীয় দেশগুলোর শান-শওকতের একটা বড় কারণ বিনিয়োগের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিশ্বজুড়ে তাদের ব্যাপারে আস্থা। এই যুদ্ধের ফলে সেই আস্থায় বড় ধাক্কা লাগল। এখন থেকে এই অঞ্চলে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেকেই দুইবার ভাববেন।

যুদ্ধ শুরু সহজ, শেষ করা নয়: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর তার গতিপ্রকৃতি কী হবে, আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সে কথা বিবেচনায় এনেছিলেন—সে রকম ভাবার কোনো কারণ নেই। মার্কিন গোয়েন্দারা বলেছিল, যুদ্ধে যাওয়া সহজ হবে, কিন্তু বেরোনো মোটেই সহজ হবে না। মার্কিন গোয়েন্দাদের সে সতর্কতায় কান দেননি ট্রাম্প। আল-হাবতুর তাঁর খোলাচিঠিতে এই কান না-দেওয়া কতটা ভুল, সে কথাই ধরিয়ে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এই যুদ্ধ কার স্বার্থে’। ট্রাম্পের গোঁড়া সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভাষ্যকার টাকার কার্লসন মন্তব্য করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছে, তারা মরবে না। মরবে সাধারণ মানুষ। তারা এই যুদ্ধ চায় না। আগামী নির্বাচনে তাদের সে মনোভাবের প্রতিফলন থাকবে।

ট্রাম্প সে কথা জানেন না, তা নয়। তবে ময়দানে নেমে তিনি ফেঁসে গেছেন। সম্প্রতি ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হল বলে। আবার এমন কথাও বলেছেন, ‘আমি ইরানের ওপর এমন আঘাত করব যে তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’ দেখা যাক, যুদ্ধ কোন দিকে গড়ায়।