আল-জাজিরা, রয়টার্স

গাজায় গত বুধবার ভোর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুটি শিশু ও তিনজন সাংবাদিক রয়েছেন। এদিন পৃথক হামলায় আরও অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, যাঁদের গাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে এবং যারা নিহত হয়েছেন, তারা সবাই ফটোসাংবাদিক ছিলেন। তাঁরা গাজার জন্য মিসরের ত্রাণ কার্যক্রম তদারককারী সংস্থা ‘ইজিপশিয়ান কমিটি ফর গাজা রিলিফ’-এর হয়ে কাজ করতেন। নিহত তিন ফটোসাংবাদিক হলেন আনাস ঘুনাইম, আবদুল রাউফ শাথ ও মোহাম্মদ কেশতা।

সহকর্মী ও চিকিৎসা কর্মকর্তাদের বরাতে জানায়, মধ্য গাজার নেতজারিম করিডরের কাছে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ করছিলেন তারা। এ সময় ইসরাইল তাঁদের ওপর হামলা চালায়। গাজায় থাকা আল-জাজিরার প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, ওই হামলায় চতুর্থ আরেক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সড়কের পাশে তাঁদের পুড়ে যাওয়া ও বোমায় বিধ্বস্ত গাড়িটি পড়ে আছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছিল। কমিটির মুখপাত্র মোহাম্মদ মানসুর বলেন, সাংবাদিকেরা বাস্তুচ্যুতদের জন্য তৈরি নতুন একটি আশ্রয়শিবিরের ছবি তুলছিলেন। ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ওই হামলা হয়েছে। যে গাড়িতে হামলা হয়েছে, সেটি যে মিসরীয় কমিটির মালিকানাধীন, তা ইসরাইলি সেনাবাহিনীর জানা ছিল।

ইসরাইলি আর্মি রেডিও ইসরাইলি নিরাপত্তাসূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছে, ইসরাইলি বিমানবাহিনী মধ্য গাজায় একটি গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, গাড়ির যাত্রীরা সেনাবাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি ড্রোন ব্যবহার করছিলেন।

এক পরিবারের তিনজন নিহত : মধ্য গাজায় পৃথক আরেকটি হামলায় একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন এক ফিলিস্তিনি বাবা, তাঁর ছেলে এবং তাঁদের আরেক স্বজন। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরকে গুলি করে হত্যা করেছেন ইসরাইলি সেনারা। ইউনিসের পাশে পৃথক আরেকটি হামলায় ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। উত্তর গাজায় ইসরাইলের হামলায় আরও দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা ওয়াফা। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসরাইল গত বছর ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওই যুদ্ধবিরতি হয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে বিবিসি বলেছে, ১০ অক্টোবর থেকে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর গাজায় অন্তত ৪৬৬ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। তা ছাড়া ইসরাইল এখনো গাজায় খাদ্য, চিকিৎসা সহায়তা ও আশ্রয়সামগ্রী প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ত্রাণ প্রবেশে সীমাবদ্ধতার কারণে গাজায় প্রায় ২২ লাখ মানুষ ঠান্ডা আবহাওয়ায় চরম মানবিক সংকটে রয়েছেন। এদিকে পশ্চিম তীরের রাশ এইন আল-আউজা গ্রামের শত শত ফিলিস্তিনি বাসিন্দা ইসরাইলি সেটলারদের আগ্রাসনের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে নিজেদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন, যার ফলে পুরো গ্রামের সব মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ৪৫ বছর বয়সী নায়েফ ঘাওয়ানমেহ দু’বছর যাবৎ মানসিক যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। তিনি তার মানসিক যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে বলেন, “রাতে ঘুমালে যদি সেটেলাররা ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, এই ভয়ে দু’বছর ঘুমাইনা। আমার জীবন এখন পুরোপুরি থেমে গেছে। আমাদের জীবন নিজ নিজ বাড়ীর মধ্যে গৃহবন্দিত্বে পরিণত হয়েছে, কারণ সেটেলাররা এখন বাড়ির ঠিক বাইরেই পশুপালন করে। ”

এই বছরের শুরু থেকে প্রায় ৬৫০ জনের মধ্যে ৪৫০ জন গ্রামছাড়া হয়েছে। বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছে। গবাদি পশুগুলো হয় চুরি করা হয়েছে, নতুবা বিষ প্রয়োগে মেরে ফেলা হয়েছে। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। এখন মাত্র ১৪টি পরিবার অবশিষ্ট, তাদের মধ্যে অনেকেরই শিশু রয়েছে এবং তাদের যাওয়ার অন্য কোনো ঠিকানা নেই। ঘাওয়ানমেহ বলেন, “পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু উত্তরাধিকার নয়, তার চেয়েও গভীর। নিজের ঘর আর গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া ভীষণ কঠিন। কিন্তু আমাদের তা করতে বাধ্য করা হয়েছে।”

শিশুদের জন্য গান পরিবেশনের মতো কিছু ক্ষণিক স্বস্তির মুহূর্ত থাকলেও পশ্চিম তীরবাসীর জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও ক্ষতির মানসিক যন্ত্রণা কাটেনি এখনো। ঘাওয়ানমেহ বলেন, “আমার জন্য যতই গান গাওয়া হোক, তাতে আমি সুখী হব না। আমি আসলে ভেঙে পড়েছি। দুই বছর ধরে সেটেলারদের নির্যাতন, কষ্ট আর সমস্যার মধ্যে দিন-রাত কাটাচ্ছি। আমি যথেষ্ট ক্লান্ত।”