পার্সটুডে, নিউইয়র্ক টাইমস, এক্সে : মার্কিন সিনেটর অ্যান্ডি কিম ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধী এবং তারা চায় না ওয়াশিংটন পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে নতুন কোনো সংঘাতে জড়াক। নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের সিনেটর অ্যান্ডি কিম সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী হুমকির প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন- আমেরিকার জনমত সামরিক পন্থাকে সমর্থন করে না। গত সপ্তাহে আমি নিউ জার্সির বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসা করেছি, তারা কি ইরানে হামলা করতে চায়? কেউই ইতিবাচক উত্তর দেয়নি। পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এরপর থেকেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়টি মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। পত্রিকার একটি প্রতিবেদন পুনঃপ্রকাশ করে এসব হুমকি প্রসঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, আমেরিকার জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করতে চায় না।

এই মার্কিন সিনেটর এর আগে সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে লিখেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আপনাদের কী দেবে? এটি কি আপনাদের আরও নিরাপদ করবে? এটি কি আপনাদের বিল পরিশোধ সহজ করবে? ট্রাম্প কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই এবং আপনাদের কথা বিবেচনা না করেই আমাদের দেশকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছেন।

ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের যুদ্ধংদেহী বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কর্মকর্তারা বারবার শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বৈধ অধিকারের ওপর জোর দিচ্ছেন। তেহরান স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের কঠোর ও দৃঢ় জবাব দেওয়া হবে। তেহরান একই সঙ্গে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কূটনীতি ও আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে এবং চাপ ও হুমকির নীতিকে অকার্যকর বলে অভিহিত করেছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পরমাণু চুক্তি নিয়ে তৃতীয় দফার আলোচনায় বসার কথা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। যা নজিরবিহীন। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে ইউএস সেন্ট্রাল কমাণ্ডের আওতাধীন অঞ্চলে তিন শতাধিক মার্কিন সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে।

এসব বিমান মূলত কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছে। পাশাপাশি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বিমানবাহী রণতরীতে থাকা ক্যারিয়ারেও উল্লেযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোতায়েনকৃত বিমানবহরে রয়েছে আক্রমণাত্মক ও সহায়ক উভয় ধরনের যুদ্ধবিমান। তবে, ৭০ শতাংশই যুদ্ধবিমান।

চলতি বছরের জানুয়ারির শুরু থেকে এই বিশাল বিমানবহর গঠনে প্রায় ২৭০টি সি ১৭ ও সি ৫ সামরিক পরিবহন ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের মাধ্যমে প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে আনুমানিক ৭৫টি কেসি–৪৬ ও কেসি ১৩৫ কৌশলগত ট্যাংকার বিমান সেন্টকম বা মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের বহরে রয়েছে অথবা সেখানে যাওয়ার পথে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোতায়েনকৃত বিমানবহরে রয়েছে আক্রমণাত্মক ও সহায়ক উভয় ধরনের যুদ্ধবিমান। তবে, মোট বিমানের প্রায় ৭০ শতাংশই যুদ্ধবিমান। এর মধ্যে ৮৪টি এফ ৮৪টি এফ-ই/এফ, ৩৬টি এফ–১৫ই, ৪৮টি এফ–১৬সি/সিজে/সিএম এবং ৪২টি এফ ৩৫এ/সি।

বাকি ৩০ শতাংশ বিশেষায়িত ভূমিকার বিমানের মধ্যে রয়েছে ১৮টি ইএ–১৮জি গ্রাউলার ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বিমান, ১২টি এ ১০সি থান্ডারবোল্ট ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট বিমান, ৫টি ই ১১এ ব্যাটলফিল্ড এয়ারবর্ন কমিউনিকেশন নোড (বিএসিএন) এবং ৬টি ই ৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস)।

তবে গত বছরের জুনে ইরানে পরিচালিত ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ ব্যবহৃত বি–২ বোমারু বিমানের নতুন কোনো গতিবিধি এখনো শনাক্ত হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক সমাবেশের পাশাপাশি ইসরায়েলও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং সম্ভাব্য অভিযানে তারাও জড়িয়ে পড়তে পারে। ইসরায়েলের কাছে বর্তমানে ৬৬টি এফ–১৫আই/সি/ডি, ১৭৩টি এফ–১৬আই/সি/ডি এবং ৪৮টি আধুনিক এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা সম্ভাব্য অভিযানে অংশ নিলে সম্মিলিত আকাশশক্তি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

এদিকে মঙ্গলবার ইসরায়েল আরও ১২টি মার্কিন এফ–২২ র্যাপ্টর স্টেলথ যুদ্ধবিমান হাতে পেয়েছে। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানায়, এই বিমানগুলো শত্রু আকাশসীমায় প্রবেশ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থা ধ্বংসে সক্ষম। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাংলি বিমানঘাঁটি থেকে আরও ৬টি এফ–২২ উড্ডয়ন করে, যা যুক্তরাজ্যের আরএএফ লেকেনহিথ হয়ে ইসরায়েলে যাওয়ার কথা রয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ কূটনীতি হলেও প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিকল্প খোলা রয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম অপশন সবসময় কূটনীতি। তবে তিনি প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণঘাতী সামরিক শক্তি ব্যবহারে প্রস্তুত।’ এই পরিস্থিতিতে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দফা পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা গত বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে ইরান একটি খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে।