আলী লারিজানি হত্যার প্রতিশোধে ইসরাইলে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে বহু হতাহতের পাশাপাশি ইসরাইলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দেশটির সাবেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. আলি লারিজানির মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে তেল আবিব শহরে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এতে হতাহত হয়েছে দুই শতাধিক ইসরাইলি। ইরান থেকে একের পর এক ধেয়ে আসা ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ও মিসাইল হামলার কারণে দেশজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ব্যাপবভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দেশটির নিরাপত্তা ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে চলমান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর ৬১তম ধাপে এসব হামলা চালানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ড. লারিজানির শাহাদাতের প্রতিশোধ নিতে বহু-ওয়ারহেড বিশিষ্ট খোররমশাহর-৪ ও কাদর ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি এমাদ ও খেইবার শেকান প্রজেক্টাইল ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে।’ আইআরজিসি দাবি করে, এই তীব্র ও দ্রুতগতির হামলায় খোররমশাহর-৪ ও কাদর ক্ষেপণাস্ত্র দখলকৃত ভূখ-ের কেন্দ্রস্থলে ১০০টির বেশি সামরিক ও নিরাপত্তা স্থাপনায় কোনো বাধা ছাড়ায় আঘাত হেনেছে। এই সাফল্যের পেছনে জায়নবাদী শাসনের বহুমাত্রিক ও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার ফল বলে উল্লেখ করেছে আইআরজিসি।
ইসরাইল জানিয়েছে, ইরান বারবার ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহার করছে। এগুলো মাঝ আকাশে ছোট ছোট বিস্ফোরকে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে যায়, যা ঠেকানো বেশ কঠিন। ইসরাইল জানিয়েছে, ইরান বারবার ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহার করছে। এগুলো মাঝ আকাশে ছোট ছোট বিস্ফোরকে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে যায়, যা ঠেকানো বেশ কঠিন। রাতে জনবহুল তেল আবিবে চালানো এ হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে যুদ্ধে ইসরাইলে নিহত মানুষের সংখ্যা অন্তত ১৪ হয়েছে।
লারিজানি হত্যার প্রতিশোধে ইসরাইলে
ক্লাস্টার বোমা হামলা ইরানের
সিএনএন
ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিবে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় প্রথমবারের মতো 'ক্লাস্টার ওয়ারহেড' বা গুচ্ছ বোমা ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি সংবাদমাধ্যম। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অভিযানে খোররামশহর-৪ এবং কদর মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিতে একাধিক সাব-মিউনিশন বা ছোট বোমা সংযুক্ত ছিল। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের মতে, তেল আবিবের জনবহুল এবং সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি এলাকায় এই হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, মাঝ আকাশে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতার কারণে এই ধরণের ক্লাস্টার বোমা প্রতিরোধ করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত দুরূহ। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, লারিজানি বা অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুতে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়বে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামিক রিপাবলিক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয় এবং দ্রুত শূন্য পদগুলোতে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে আসা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এক সরকারি কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে, খামেনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পরাজয় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত শান্তির কোনো সুযোগ নেই। সংঘাতের আবহে ইরানের অভ্যন্তরীণ উত্তাপও বাড়ছে। সম্প্রতি মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে কুরোশ কেইভানি নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুদ- কার্যকর করেছে তেহরান। তেহরানের আইআরজিসি সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ইসরাইলি বিমান হামলা চললেও এর জবাবে ইরান বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার কথা স্বীকার করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এতে কোনো তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইসরাইলে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
সৌদি-কুয়েত এবং ইরাকে
ড্রোন ও রকেট হামলা
এমটিআই
সৌদি আরব, কুয়েত এবং ইরাকে ড্রোন ও রকেট হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দুটি আলাদা বিবৃতিতে গতকাল বুধবার জানিয়েছে, তাদের পূর্বাঞ্চলে ড্রোন দিয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। অপরদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের দিকে রকেট ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। যেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অপরদিকে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হয়েছে। ড্রোনের কারণে সেখানে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের বাজিমাত
দশকব্যাপী পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ছায়া ট্যাঙ্কার বহর তৈরি করেছিলো ইরান। এখন সেই লড়াকু কৌশলের কাছেই নতিস্বীকার করতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরান এমন এক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে পশ্চিমা সম্পৃক্ততা থাকা জাহাজগুলো এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ইরানের নিজস্ব জাহাজগুলো অনায়াসেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ইরান ও রাশিয়ার মতো শত্রুদের দমাতে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, ইরান সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পারস্য উপসাগরে অন্তত ১৭টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। ফলে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে চাওয়া পশ্চিমা মালিকানাধীন জাহাজগুলোর বিমা প্রিমিয়াম এখন আকাশচুম্বী। অ্যানালিটিকস ফার্ম কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এই জলপথে যান চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২০টিরও বেশি দূরপাল্লার ট্যাঙ্কার নিরাপদে প্রণালি পার হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি জাহাজ সরাসরি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে অথবা ইরানের সেই বিখ্যাত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ।
কর্নল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক এবং ‘দ্য ইকোনমিক ওয়েপন: দ্য রাইজ অব স্যাংশনস অ্যাজ এ টুল অব মডার্ন ওয়ার’-এর লেখক নিকোলাস মুল্ডার বলেন, “দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় ইরান এমন এক প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক অস্ত্র অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার নেতিবাচক প্রভাব থেকে তাদের রক্ষা করছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞাই ইরানকে এ যুদ্ধের ধাক্কা থেকে কৃত্রিমভাবে সুরক্ষিত রেখেছে। ইরানের এ ছায়া ট্যাঙ্কার বহর পশ্চিমা বিমার ওপর নির্ভর করে না।” ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স ডটকমের সহ প্রতিষ্ঠাতা সমীর মাদানি জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান দৈনিক ১০ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করতে সক্ষম হয়েছে, যার সিংহভাগই গেছে চীনে। গত বছর এ গড় ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল।
কেপলারের শিপিং বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ রাইট বলেন, যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের রফতানি সক্ষমতা অটুট ছিল। অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে ইরান বেশি অপরিশোধিত তেল সরাতে পারছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কাটা গায়ে নুনের ছিটা’র মতো।
২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরানের এ ছায়া বহর পূর্ণ শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের বিকল্প পথ তৈরি হচ্ছে। বেলজিয়ামভিত্তিক সুইফট বা পশ্চিমা বিমা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে চীন ও রাশিয়া এখন ইউয়ান ও রুবলের মাধ্যমে লেনদেন করছে। এমনকি, ইরান চীনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাম পরিশোধ করেছে তেলের মাধ্যমে। রিস্ক ইন্টেলিজেন্সের সিনিয়র অ্যানালিস্ট ডার্ক সিবলস বলেন, “নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। ইরানের তেল চীনে নেওয়াটা অবৈধ কিছু নয়, এটি কেবল পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য আইনি বাধা।”
ম্যারিন অ্যানালিস্টদের মতে, ইরান এখন ইয়েমেনের হুথিদের রণকৌশল অবলম্বন করছে। লোহিত সাগরে হুথিরা যেভাবে বাছাই করে পশ্চিমা জাহাজ লক্ষ্যবস্তু বানাত এবং চীন-রাশিয়ার জাহাজকে নিরাপদ পথ দিতো, ইরান এখন হরমুজ প্রণালিতে তার চেয়েও উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে সেই মডেল অনুসরণ করছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজ করাচি (লোরাক্স) এবং ভারতের দুটি এলপিজি ট্যাঙ্কার ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদে প্রণালি পার হয়েছে। শিপিং অ্যানালিস্ট মিশেল উইস বকম্যান বলেন, “ইরান হুথিদের পরিকল্পনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। তারা পশ্চিমা সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে এলাকা থেকে দূরে রাখতে সফল হচ্ছে।”
হরমুজ প্রণালির এ অচলাবস্থা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। ট্রাম্প একদিকে ন্যাটো মিত্রদের কাছে সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ঝাড়ছেন, অন্যদিকে এ জলপথ পাহারার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তিনি বলেন, “আমরা কেন হরমুজ প্রণালি পাহারা দিচ্ছি যখন এটি মূলত চীন ও অন্যান্য দেশের কাজে লাগছে? তারা কেন এটা করছে না?” যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচুর তেল আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারিত হয় বিশ্ববাজারের ওপর ভিত্তি করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক পরাগ খান্না বলেন, “পাকিস্তান ও ভারত যেভাবে ইরানের সঙ্গে সরাসরি রফা করে জাহাজ পার করছে, তা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যাদের বোমা মারতে চায়, তাদের মাধ্যমেই বিশ্ব বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে দাবি তারা করতো, তা এখন ধূলিসাৎ।”