আল জাজিরা, রয়টার্স,আনাদোলু

পবিত্র রমজানের প্রথম দিন গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি যুবক নিহত হয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। খান ইউনিসের নাসের হাসপাতাল এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানায়, পূর্বাঞ্চলের বানি সুহেইলা মোড়ের কাছে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গুলিতে মুহান্নাদ আল নাজ্জার নামে এক যুবক নিহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, ভোর থেকেই পূর্ব খান ইউনিস এলাকায় ইসরাইলি সামরিক যান থেকে ভারী গুলিবর্ষণ করা হয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ গাজার রাফাহর উত্তরে একটি এলাকায়ও গুলি চালানো হয়। এ ছাড়া মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাংশে গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। গাজা সিটি ও উত্তরাঞ্চলেও ইসরাইলি যানবাহন থেকে পূর্ব বেইত লাহিয়ার দিকে গুলি ছোড়া হয়। দক্ষিণ-পূর্ব গাজা সিটির জেইতুন এলাকার আল সিক্কা সড়কের আশপাশেও কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। তবে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও শতাধিক লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৬০৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ হাজার ৬১৮ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আগের সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট–এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই গাজায় ৭৫ হাজারের বেশি ‘সহিংস মৃত্যু’র ঘটনার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস–নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে যে অতিরঞ্জিত তথ্য দেয়নি, ধারাবাহিক এসব গবেষণা সেটিই স্পষ্ট করেছে। সেই সঙ্গে তা ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানির বিস্তৃতি নিয়ে শক্তপোক্ত ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহতের সংখ্যা বিশ্বাসযোগ্য। তবে সেখানে বিধ্বস্ত ভবনগুলোর নিচে এখনো কত মরদেহ চাপা পড়ে আছে, সেটা জানা না থাকায় সংখ্যাটি সবচেয়ে কম ধরা হয়েছে।

মাইকেল স্পাগাট, রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত ‘গাজা মরটালিটি সার্ভে’ বা জিএমএস নামের খানাভিত্তিক জরিপে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় ৭৫ হাজার ২০০ জনের ‘সহিংস মৃত্যুর’ খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগে গাজার মোট জনসংখ্যা ২২ লাখের প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময় গাজায় ৪৯ হাজার ৯০ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিল হামাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ল্যানসেটে প্রকাশিত হিসাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের চেয়ে ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এ বছরের ২৭ জানুয়ারি গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭১ হাজার ৬৬২–এ দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর নিহত হয়েছেন ৪৮৮ জন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়। ইসরায়েল বরাবরই গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হতাহতের তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও গত জানুয়ারিতে ইসরায়েলি এক সেনা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধ চলাকালে গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীও মনে করছে।

ইসরায়েল বরাবরই গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হতাহতের তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও গত জানুয়ারিতে ইসরায়েলি এক সেনা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধ চলাকালে গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীও মনে করছে। নিহতের সংখ্যাটি বেশি হলেও গবেষকদের মতে, হতাহতদের জনমিতিক হার ফিলিস্তিনের সরকারি তথ্যের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্কদের হার সব মিলিয়ে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। ফিলিস্তিনের সরকারি হিসাবের সঙ্গে এ তথ্য অনেকটাই কাছাকাছি। গাজা মরটালিটি সার্ভেতে ২ হাজার খানার ৯ হাজার ৭২৯ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। নিহতের সংখ্যা নির্ধারণে একটি কঠোর প্রমাণভিত্তিক গবেষণাকাঠামো অনুসরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাট বলেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহতের সংখ্যাটি বিশ্বাসযোগ্য। তবে সেখানে বিধ্বস্ত ভবনগুলোর নিচে এখনো কত মরদেহ চাপা পড়ে আছে, সেটা জানা না থাকায় সংখ্যাটি সবচেয়ে কম ধরা হয়েছে।