রয়টার্স

সংকট আর সংঘাত-সহিংসতায় আরও একটি বছর পার করল বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা ২০২৫ সালে যুদ্ধ ও বর্বরতার সাক্ষী হয়েছে পৃথিবীর সব প্রান্ত। চরম মানবিক সংকট আর নৃশংসতার মধ্য দিয়ে আরও একটি বছর পার করেছে গাজাবাসী। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, ফিলিস্তিনিদের ওপর যে নারকীয় বর্বরতা শুরু হয়েছিল; তা অব্যাহত রয়েছে ২০২৫ সালেও। কাগজে-কলমে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হলেও, এখনো পুরোপুরি হামলা বন্ধ হয়নি উপত্যকাটিতে।

গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ২০২৫ সালজুড়ে ছিল অস্থিরতা। গাজার গ-ি ছাড়িয়ে একের পর এক দেশ হয়েছে ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার। জুনে ১২ দিনের সংঘাতে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয় ইরান-ইসরাইল। তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে এতে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রও। যদিও ভয়াবহ যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আগে মার্কিন মধ্যস্ততায় থেমেছে এই সংঘাত।

হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তির পরও ২০২৫ সালে লেবাননে হামলা বন্ধ করেনি তেলআবিব। আগ্রাসন চালিয়েছে ইয়েমেন, কাতার ও সিরিয়ায়। মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল ছিল অভ্যন্তরীণ সংঘাতেও। বাশার আল আসাদের পতনের পরও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতের কারণে অশান্ত ছিল সিরিয়া। ইয়েমেনেও চলছে ক্ষমতা দখলের লড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছে আরও একটি বছর। রাশিয়া ও ইউক্রেন সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলছে দফায় দফায় বৈঠক। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ থামাতে এখনো একমত হতে পারেনি।

যুদ্ধের কারণে ২০২৫ সালেও মানবেতর জীবন যাপন করেছে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দারা। সাড়ে তিনবছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সুদান সাক্ষী হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের। ক্ষমতার লড়াইয়ে চলতি বছর চরম ভয়াবহতার সাক্ষী হয়েছে কঙ্গোর উত্তরাঞ্চল। নাইজার, মালি বুরকিনা ফাসোসহ পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বছরজুড়ে ছিল বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর অপতৎপরতা। সংঘাত থেকে বাদ যায়নি দক্ষিণ এশিয়াও। দুই পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ থেমেছে ৪ দিনে। প্রতিবেশি আফগানিস্তানের সাথেও একাধিকবার সংঘাতে জড়িয়েছে পাকিস্তান। আগের বছরের মতোই ২০২৫ সালজুড়ে গৃহযুদ্ধ দেখেছে মিয়ানমার। সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়েছে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াও। মহড়া আর হুমকি-ধামকিতে বছরব্যাপী অস্থিরতা ছিল চীন-তাওয়ানের মাঝে। উত্তাপ ছড়িয়েছে উত্তর কোরিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও।

২০২৪-এর পর ২০২৫ সালেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে বিভিন্ন দেশ। গ্লোবাল প্রোটেস্ট ট্রাকারের তথ্য, এ বছর দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশে আন্দোলন হয়েছে। যার মধ্যে নেপাল ও বুলগেরিয়াসহ একাধিক দেশে হয় সরকার পতন। মার্কিন রাজনীতির পালাবদলে ২০১৫-এ আবারও ক্ষমতায় ফিরেই বিশ্বে রীতিমতো শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অস্থিতিশীল হয়ে উঠে বিশ্ব অর্থনীতি। দফায় দফায় আলোচনার পর এখনো অনেক দেশের ওপর আরোপিত রয়েছে বড় অংকের মার্কিন শুল্ক। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ চরম বৈরি আবহাওয়ার কবলে পড়েছে। বছরজুড়েই ছিল ভূমিকম্প, দাবানল আর ঝড়-বন্যার প্রকোপ। যাতে বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ।

যুদ্ধবিরতির আগে গাজায় পেতে রাখা হয় ভয়ংকর ট্রাক বোমা: গাজা সিটিতে যুদ্ধবিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন এক বিধ্বংসী কা- ঘটায়। তাদের সেই ভয়ংকর রণকৌশলের তথ্য উঠে এসেছে রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইসরায়েল বর্তমানে সাধারণ সাঁজোয়া যান বা এপিসিগুলোকে শক্তিশালী ট্রাকে রূপান্তরিত করে সেগুলোতে এক থেকে তিন টন পর্যন্ত বিস্ফোরক বোঝাই করে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যবহার করছে। বিশেষ করে তেল-আল-হাওয়া এবং সাবরা এলাকায় এই ধরণের ‘ট্রাক বোমা’র ব্যাপক ব্যবহারের ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং শত শত ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আগের সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি সেনারা গাজা সিটির কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হয়। সেসময় বিমান হামলার পাশাপাশি এই এপিসি বোমা ও ভারী বুলডোজার ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। থেকে পাওয়া ছবি এবং ড্রোন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তেল-আল-হাওয়া উপশহরের মতো একসময়ের সমৃদ্ধ এলাকাগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা হেশাম মোহাম্মদ বাদাবি জানান, তার পাঁচ তলা ভবনটি কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই পাঁচটি পরপর বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে ঘটনাস্থলে বিস্ফোরিত সাঁজোয়া যানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এটা প্রমাণ করে ভবনগুলো সাধারণ কোনো হামলায় নয় বরং পরিকল্পিতভাবে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ি দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনবহুল এলাকায় কয়েক টন বিস্ফোরক ভর্তি এপিসি ব্যবহার করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং এটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, হামাসের পাতা ফাঁদ নিষ্ক্রিয় করতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। তবে এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দুই হাজার পাউন্ড ওজনের ভারী বোমার সরবরাহ স্থগিত করার পর ইসরায়েল এই বিকল্প ও স্বল্পপ্রযুক্তির বিধ্বংসী পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে হামাসের হামলায় ইসরায়েলি ডি-নাইন বুলডোজারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং সেগুলোর বিক্রিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দিতে এখন এই ভয়াবহ ‘এপিসি বোমা’র ওপর নির্ভর করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার মতে, এর ফলে গাজা সিটির অন্তত ৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।