গাজায় দখলদার ইসরাইলের ভয়াবহ আগ্রাসন চলছেই। অবরুদ্ধ উপত্যকায় অব্যাহত হামলায় একদিনে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৫৯ জন ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন অন্তত আরও ২৪৪। এ নিয়ে গাজায় প্রাণহানির সংখ্যা ৬৩ হাজার ছাড়াল। মেহের নিউজ, সাবা, আল জাজিরা, এএফপি।

মূলত, গাজা সিটিতে বিমান হামলার পাশাপাশি আরও জোরদার হয়েছে স্থল অভিযান। দক্ষিণে খান ইউনিস, উত্তরে জয়তুন ও শেখ রেদওয়ানসহ গাজার প্রত্যেকটি অংশেই চলছে নির্বিচার হামলা। বোমাবর্ষণের কারণে আহতদের হাসপাতালে নেওয়াও হয়ে উঠেছে প্রায় অসম্ভব। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়াদের উদ্ধারে নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। বেশিরভাগ হাসপাতাল ধ্বংস হওয়ায় আহতরাও মারা যাচ্ছে বিনা চিকিৎসায়। এছাড়া শুক্রবার অনাহার ও অপুষ্টিতে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা নিয়ে উপত্যকায় অনাহার-অপুষ্টিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১২১ শিশুসহ ৩২২ জনে। প্রায় দুই বছর ধরে চলমান ইসরাইলী আগ্রাসনে গাজায় প্রাণহানির পাশাপাশি কেবল ত্রাণ সংগ্রহকারীদের ওপর হামলায় প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০৩ জন। উল্লেখ্য, অবরুদ্ধ এই ভূখ-ে আগ্রাসনের জন্য আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলার মুখোমুখিও হয়েছে ইসরাইল। তবুও থেমে নেই তাদের বর্বরতা। এ নিয়ে নিন্দার ঝড় বইছে বিশ্বব্যাপী।

গাজা দখলদার ইসরাইলের জন্য ভয়াবহ অভিশাপে পরিণত হবে

গাজা উপত্যাকা দখল করাটা অবৈধ দখলদার ইসরাইলের জন্য ‘ভয়াবহ এক অভিশাপে পরিণত হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসসাম ব্রিগেডসের মুখপাত্র আবু উবাইদা। এক ঘোষণায় তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং ইসরাইল যদি গাজা দখলের চেষ্টা করে, তাহলে এর ফল হবে আরও ভয়াবহ, আরও বেশি সামরিক হতাহত ও নতুন বন্দিত্ব। আবু উবাইদার ভাষায়, ‘শত্রুর অপরাধমূলক গাজা দখল পরিকল্পনা তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের জন্য অভিশাপে পরিণত হবে’। বার্তায় আল-কাসসাম ব্রিগেডসের মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনি বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে এবং গাজা দখলের যে কোনো শত্রু পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের জন্য ভয়াবহ বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরও সতর্ক করে জানান, শত্রুর দখল প্রচেষ্টার মূল্য দিতে হবে ইসরাইলী সেনাদের প্রাণ দিয়ে এবং এতে নতুন বন্দি হওয়ার সম্ভাবনাও আরও বেড়ে যাবে। আবু উবাইদা বলেন, ‘আমাদের যোদ্ধারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও মনোবলে রয়েছে। তারা অতুলনীয় বীরত্ব ও সাহসিকতার উদাহরণ প্রদর্শন করছে। ইনশাআল্লাহ, তারা আগ্রাসীদের কঠিন শিক্ষা দেবে’।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আল-কাসসাম মুখপাত্র বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহু ও তার নাৎসি মন্ত্রীরা জোর করে তাদের জীবিত বন্দিদের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিহত বন্দিদের লাশও গায়েব করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে’। তিনি যোগ করেন, হামাস যতটা সম্ভব শত্রুর বন্দিদের সংরক্ষণ করবে, আর তারা ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রেই থাকবে। পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘দখলদার সেনারা নিহত হলে তাদের প্রতিটি নাম, ছবি ও মৃত্যুর কারণ আমরা প্রকাশ করব’।

আকাশসীমা বন্ধসহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নিল তুরস্ক

গাজায় আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইসরাইলী বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে তুরস্ক। তুর্কি বন্দর ব্যবহারেও দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। সংসদের এক বিশেষ অধিবেশনে বক্তৃতায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এ ঘোষণা দেন। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বক্তৃতায় ফিদান বলেন, গত দুই বছর ধরে সারা বিশ্বের চোখের সামনে মৌলিক ও মানবিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে গাজায় গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তেলআবিব। ইসরাইলের সঙ্গে আমরা বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছি। তুরস্কের কোনো জাহাজকে ইসরাইলী বন্দরে যাওয়ার অনুমতি আমরা দিই না। আমাদের আকাশসীমায় তাদের বিমান প্রবেশ করতে দিই না। এর আগে গত বছরের মে মাসে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য বন্ধ করে দেয় তুরস্ক। এ সময় গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা প্রবেশের দাবি জানায় আঙ্কারা। ২০২৩ সালে ইসরাইল ও তুরস্কের মধ্যে ৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছিল।

ইসরাইলে হামলা আরও বাড়ানোর

ঘোষণা ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর

দখলদার গণহত্যাকারী ইসরাইলী কর্তৃপক্ষের কথিত হত্যাচেষ্টার দাবির জবাবে ইসরাইলে ইয়েমেনি হামলা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইয়েমেনের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা। একই সঙ্গে, শেষ পর্যন্ত গাজায় গণহত্যা বন্ধ করতে তেলআবিবকে বাধ্য করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুলকরিম আল-গামারি দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘গাজায় কিংবা ইয়েমেনের প্রতি জায়নিস্ট আগ্রাসন শক্তির নিদর্শন নয়; বরং এটি প্রায় দুই বছর ধরে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতার প্রতিফলন। এর জবাবে প্রতিরোধ আরও তীব্র হবে’।

ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনী প্রধানের এই হুঁশিয়ারি এমন সময়ে এলো, যার দিন আগে ইসরাইলী গণমাধ্যম দাবি করে যে, তেলআবিবের বিমান হামলায় ইয়েমেনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সম্ভবত ‘হত্যা’ করা হয়েছে, যার মধ্যে গামারি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ আল-আতিফিও রয়েছেন। বিমান হামলাটি ইয়েমেনের রাজধানী সানায় চালানো হয়। এর আগে জুন মাসেও ইসরাইলী হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন গামারি। এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জায়নিস্ট শত্রু সানার বেসামরিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর দায় এড়ানো যাবে না’। তিনি একে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে নির্মূল করার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন।

যুদ্ধবাজ ইসরাইল গত বছর থেকে ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে আসছে। যখন হুথি নিয়ন্ত্রিত সানার সামরিক বাহিনী গাজার সঙ্গে সংহতি জানিয়ে একের পর এক হামলা চালাতে থাকে। গাজায় গণহত্যামূলক আগ্রাসন শুরু হওয়ার এক বছর পর থেকেই এই হামলা পালটা হামলা শুরু হয়। ইসরাইল এরপর উপকূলীয় এ অঞ্চলটিতে খাদ্য সরবরাহ কার্যত অবরুদ্ধ করলে ইয়েমেনি বাহিনী নিজেদের হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এদিকে, গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ আগ্রাসন চলছেই। অবরুদ্ধ উপত্যকায় হামলায় একদিনে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৫৯ জন। আহত হয়েছে অন্তত আরও ২৪৪। এ নিয়ে গাজায় প্রাণহানির সংখ্যা ৬৩ হাজার ছাড়াল। এ বিষয়ে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনী প্রধান পুনরায় দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে বলেন, ‘গাজাকে সমর্থন দেওয়া থেকে ইয়েমেন কোনোভাবেই পিছিয়ে যাবে না লক্ষ্যবস্তু হওয়া বা ত্যাগ স্বীকার যাই হোক না কেন’।