দ্য গার্ডিয়ান : পশ্চিম তীরে ইসরাইলের আগ্রাসন কমছেই না। কখনও নাগরিক তো কোনও সময় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে ভূমি দখলের পাশাপাশি হত্যা করা হচ্ছে ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিকদের। চলতি দশকের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে যত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে সে জন্য ইসরাইলি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা হয়নি। এর মাধ্যমে সহিংসতার জন্য দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি করছে। নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম। নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলাগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) দ্বারস্থ হয়েছেন ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইহুদ ওলমার্ট। বিষয়টি নিয়ে তিনি আইসিসির হস্তক্ষেপ চাচ্ছেন, যাতে ফিলিস্তিনি ও নিরীহ ইসরাইলিদের রাষ্ট্র সমর্থিত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা থেকে রক্ষা করা যায়। ওলমার্ট বলেন, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর চুপ থাকবো না। আইসিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে হেগে অবস্থিত এ সংস্থা ব্যবস্থা নিতে পারে এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারে।” ইসরাইলের সাবেক নিরাপত্তা কমান্ডাররাও ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘প্রায় প্রতিদিন’ হওয়া হামলা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। দেশের বর্তমান সামরিক প্রধানের কাছে এক প্রকাশ্য চিঠিতে তারা সতর্ক করে বলেছেন, “ইহুদি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ব্যর্থতা অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করছে।”

চলতি মাসে এ পর্যন্ত শুধু পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ও পুলিশ ১০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। এর মধ্যে রয়েছে দুই ফিলিস্তিনি ভাই, যাদের বয়স যথাক্রমে পাঁচ ও সাত। ঈদের শপিং শেষে বাড়িতে ফেরার সময় ওই দুই ভাইকে হত্যা করা হয়।

ওই চিঠিতে লেখা ছিল, “আমরা কয়েকজন আইনভঙ্গকারী উচ্ছৃঙ্খল লোকের কথা বলছি না। এটি একটি সংগঠিত কার্যক্রম, যেখানে কখনও কখনও ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিরাও জড়িত থাকে। যারা নিরীহ মানুষের দিকে গুলি চালায় এবং বেসামরিক নাগরিকদের সম্পত্তি ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়।”

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর দু’জন সাবেক প্রধান—যাদের একজন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া মোসাদ ও শিন বেত গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক পাঁচজন প্রধান এবং চার জন সাবেক পুলিশ কমিশনারও রয়েছেন।

আইন প্রয়োগের তাদের এ আহ্বানে অতীতের সামরিক সাফল্যকে ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনীর নৈতিক শক্তির ফল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ বিজয়ের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছাড়া আমাদের অস্তিত্বের কোনও অধিকার নেই।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২০ সালের পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা অন্তত ১ হাজার ১০০ ফিলিস্তিনি নাগরিককে হত্যা করেছে। এসব হত্যার ঘটনায় কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। আইনি অধিকার সংস্থা ইয়েস দিন’র তথ্য অনুযায়ী, দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বশেষ প্রাণঘাতী হামলার সবশেষ অভিযোগ গঠন হয়েছিল ২০১৯ সালে। আর কোনও ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিককে হত্যাকা-ের জন্য অভিযোগ গঠন হয়েছিল ২০১৮ সালে। ফিলিস্তিনি নাগরিক আইশা রাবিকে হত্যার বিষয়ে চলতি সপ্তাহে রায় দিয়ে ইসরাইলের একটি আদালত। রায়ে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি একটি পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন, যা আইশা রাবিকে আঘাত করেছিল।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিহত অধিকাংশ ফিলিস্তিনির জন্য ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনী দায়ী। তবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইলি নাগরিকদের সহিংসতা বেড়ে যায়। বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের মধ্যে রয়েছে হত্যা, মারধর, অগ্নিসংযোগ, চুরি ও যৌন নির্যাতন। এসব অপরাধের অনেকগুলোর প্রমাণও রয়েছে। তবে অপরাধ করেও সম্পূর্ণভাবে শাস্তিহীন রয়ে গেছে ইসরাইলিরা।

ইয়েস দিন বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে পুলিশের তদন্তের ৯৬ শতাংশেরও বেশি কোনও অভিযোগ গঠন ছাড়াই শেষ হয়েছে। ৩৬৮টি মামলার মধ্যে মাত্র আটটিতে দ-াদেশ দেওয়া হয়, যা মোট মামলার মাত্র দুই শতাংশ।

ওলমার্ট সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এসব বসতি স্থাপনকারীরা সরকারি মহলের সহায়তা, সমর্থন ও প্রেরণায় জাতিগত নির্মূলে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানান তিনি। বলেন, “ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে সংঘটিত কার্যক্রমগুলো অতীতে ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।”

ইসরাইলের সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ইসরাইলের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি তাদের দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে হয়তো আন্তর্জাতিক আইনি কর্তৃপক্ষ আমাদের চোখের সামনে ইহুদি সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকা- থেকে ফিলিস্তিনি ও আমাদের রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।”

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি, ওলমার্ট ও চিঠিতে স্বাক্ষরকারী কমান্ডাররা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখনও বসতি স্থাপন বন্ধ ছিল না।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইসরাইল/ফিলিস্তিন বিশ্লেষক আমজাদ ইরাকি বলেন, “ফিলিস্তিনিরা এ ইসরাইলি সমালোচনাকে স্বাগত জানাতে পারে। কিন্তু তারা ভুলে যায়নি, এসব সাবেক কর্মকর্তাদের অনেকেই বসতি সম্প্রসারণে সহায়তা করেছিলেন।