বিবিসি,রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধবিরতি গত অক্টোবর গাজা যুদ্ধ থামালেও হামাসের লড়াই থামেনি। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে টিকে থাকার যুদ্ধ থেকে এবার তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। যুদ্ধে হামাসের শৃঙ্খলাবদ্ধ সামরিক ইউনিটগুলো ভেঙে গেরিলা বাহিনীতে পরিণত হয়। অধিকাংশ নেতা নিহত হন। গাজার ভবন ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়, জনগণ বাস্তুচ্যুত হয়, অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সংঘাতে ইসরায়েলি হামলায় ৭২ হাজারের বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছেন। চার মাস পর গাজার বাসিন্দারা বলছেন, নিরাপত্তা, কর রাজস্ব ও সরকারি সেবায় আবারও নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে হামাস। এতে সংগঠনটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে অস্ত্র ও কর্তৃত্ব ছাড়ার শর্ত সামনে থাকায়।
গাজার এক কর্মী মোহাম্মদ দিয়াব বলেন, যেসব এলাকায় হামাস উপস্থিত, তার ৯০ শতাংশের বেশি জায়গায় তারা আবার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো রাস্তায় ফিরেছে। তারা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে, যাদের সহযোগী বা ভিন্নমতাবলম্বী বলে চিহ্নিত করছে তাদের পিছু নিচ্ছে। পরিচয়পত্র বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কাজে নাগরিকদের হামাস কর্তৃপক্ষের কাছেই যেতে হচ্ছে। বিচারব্যবস্থা ও আদালতেও তারা আবার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। গাজার বিভিন্ন বাজারে দোকানিরা নিয়মিত পুলিশ টহলের কথা বলছেন। একই সঙ্গে সরকারি ফি ও কর আদায়ে ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণ’ ফিরেছে। এক দোকানি বলেন, বাজার শান্ত, কিন্তু পৌরসভা ভাড়া আদায়ে চাপ দিচ্ছে। গাজায় হামাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যাদের সঙ্গে বিবিসর কথা হয়েছে, সবাই পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন।
তাদের একজন বলেন, প্রতিদিন তারা আসে। একই দাবি, একই দৃঢ়তা। বলে টাকা না দিলে আমাদের আর পণ্য রাস্তায় ফেলে দেবে। ৭০০ শেকেল চাচ্ছে, যা আমাদের কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। গাজা সিটিতে কথা বলা ওই দোকানি জানান, শহরের পূর্বের শুজাইয়া এলাকা থেকে তিনি ও তার ১২ সদস্যের পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে তার দোকান ছিল।
এখন শুজাইয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত সমতল ভূমি। পাশেই সিগারেট বিক্রি করা আরেক ব্যক্তি বলেন, প্রতিদিন পৌরসভার লোকেরা আসে। তারা পণ্য আর বিক্রি গুনে দেখে। বলুন তো, আমি তাদের টাকা দেব, নাকি সন্তানদের খাওয়াব? যুদ্ধবিরতির পর গাজায় খাদ্য ও কিছু নিত্যপণ্য তুলনামূলক সহজে প্রবেশ করছে। ইসরায়েল থেকে আমদানির লাইসেন্সধারী কয়েকজন প্রধান ব্যবসায়ী বলছেন, আমদানির ওপর আবারও কঠোর কর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে হামাস।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, পণ্যের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী কর নির্ধারণ হয়। ২০ হাজার শেকেল থেকে শুরু। তিনি দাবি করেন, কেউ কর দিতে অস্বীকার করলে বলপ্রয়োগ করা হয়, কখনও অপহরণ বা হুমকিও দেওয়া হয়। পণ্যের ওপর কর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, কর পরিশোধ নিয়ে আলোচনায় ব্যবসায়ীরা হামাসের জন্য সংকেত শব্দ ব্যবহার করেন, যাতে ইসরায়েল বুঝতে না পারে যে অর্থ সংগঠনটির কাছে যাচ্ছে।
অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ দিয়াব বলেন, গাজায় পণ্য আমদানিকারী সব ব্যবসায়ীর তথ্যভান্ডার এখন হামাসের কাছে আছে। ব্যাংক ট্রান্সফারের বদলে নগদ অর্থে লেনদেন হয়, যাতে অর্থপ্রবাহ অনুসরণ করা না যায়। অতীতে যে ব্যবস্থা ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, গাজা এখন জরুরি অবস্থায় রয়েছে এবং ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা প্রয়োজন। তার কথায়, কিছু ব্যবসায়ী ইসরায়েলি দখলদারদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং অতিরিক্ত মুনাফা করতে চায়। তাই যারা সহযোগিতা করে না বা প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক সংস্থাগুলো কখনও কঠোর হতে বাধ্য হয়। এটি পুরোপুরি একটি সরকারি বিষয়, হামাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।