ফার্স নিউজ, আনাদোলু ,এএফপি

মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে বিশাল নৌবহর ভারত মহাসাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। ইরানকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য যে কোনো অভিযানে সহায়তা করতে এটিকে সুবিধাজনক এলাকায় নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীন অঞ্চলে রয়েছে, যেখান থেকে অতীতে বিভিন্ন যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে হামলা চালানো হয়েছিল। এতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার বিকল্পগুলো বিবেচনা করছেন। তবে এখনও কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানা যায়নি।

নৌবহরে সাধারণত একটি বিমানবাহী রণতরী, ক্ষেপণাস্ত্র ক্রুজার, বিমানবিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন ধ্বংসকারী বা ফ্রিগেট থাকে। মার্কিন মিত্ররা ইরানের ওপর কোনো ধরনের সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। সতর্ক অবস্থায় রয়েছে ইরানও। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্প বা আইআরজিসি বলেছে, তারা পরিস্থিতি ‘গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছেন। সংস্থার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার প্রেস টিভি জানায়, তেহরানের ক্ষমতা সম্পর্কে ‘অসম্পূর্ণ ধারণার’ ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস– ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান ‘দ্রুত ও পরিচ্ছন্ন’ হবে। আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ‘ভুল গণনা এড়ানো উচিত’। এ অবস্থায় ভারতের বিমান পরিবহন সংস্থা ইন্ডিগো ইরানের ওপর দিয়ে বিমান পরিবহনে তাদের সূচি পরিবর্তন করেছে। তারা বাকু, তাসখন্দসহ বেশ কয়েকটি শহরে আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইছে। গত সোমবার রাতে অ্যাক্সিওস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে পরিস্থিতি ‘পরিবর্তনশীল’। তার বিশ্বাস, তেহরান সত্যিই একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। অ্যাঙ্গিওসের উদ্ধৃতি দিয়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলেন, সামরিক আক্রমণ এখনও একটি বিকল্প। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প এ নিয়ে আরও আলোচনা করবেন। সেখানে সামরিক বিকল্প পর্যালোচনার বিষয়টি থাকবে। গত সোমবার রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় প্রবেশ করে। কার্যত এটি ইরানের কাছে মার্কিন সামরিক অবস্থানের উল্লেখযোগ্য শক্তিবৃদ্ধি। এ নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের পাশে আমাদের একটি বৃহৎ নৌবহর রয়েছে। ভেনেজুয়েলার চেয়েও বড়।’ এর পরই তিনি বলেন, ‘টেবিলে কূটনীতি। তারা একটা চুক্তি করতে চায়। আমি জানি। তারা অনেকবার ফোন করেছে। তারা কথা বলতে চায়।’

যে কোনো আক্রমণের জবাব দিতে প্রস্তুত : তেহরান থেকে মাজিয়ার মোতামেদি আলজাজিরাকে জানান, ইরানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তারা জুনের ১২ দিনের সংঘাতের মতো আক্রমণের ক্ষেত্রে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে দেশটির প্রস্তুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘ব্যাপক ও অনুশোচনাপ্রসূত প্রতিক্রিয়া’ দেওয়ার অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে। গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করে বলেন, ‘এর ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা নিঃসন্দেহে সবার ওপর প্রভাব ফেলবে।’

প্রেস টিভি জানায়, ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদ্রেজা হাজিবাবাই সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আক্রমণ চালায়, তবে তাঁর দেশ ‘নির্ধারক প্রতিক্রিয়া’ দেবে।

বাহরাইনে এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে ইন্দোনেশিয়ার সংসদীয় প্রতিনিধি দলের প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে হাজিবাবাই বলেন, ট্রাম্প সামরিক আগ্রাসন ও সম্পদের শোষণাকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করছেন। তিনি বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র কখনও হুমকি, উত্তেজনা বা সংঘর্ষ শুরু করেনি; করবেও না। তবে, আমাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অধিকারের ওপর ভিত্তি করে এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুসারে যে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক, তাৎক্ষণিক ও আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরানের ওপর আক্রমণের জন্য তাদের ভূমি, আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এ ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য কোনো লজিস্টিক সহায়তাও দেবে না।

ইরানের আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা ক্ষীণ, বলছেন বিশ্লেষকরা : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলি ভায়েজ আলজাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবির কাছে ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা ‘শূন্যের কাছাকাছি’। ইরানের নেতাদের বিশ্বাস, ‘চাপের মুখে আপস করলে পরিস্থিতি শান্ত হবে না, বরং আরও বেশি কিছু আমন্ত্রণ জানানো হবে।’ তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সিদের সঙ্গে সম্পর্কিত দাবির ক্রমবর্ধমান তালিকা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প গোলপোস্ট সরিয়ে নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে (ইরানকে) নতজানু হতে দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার কারণে যদি এবার যুদ্ধ বাঁধে তাহলে ইরান এক মিলিমিটারও পিছপা হবে না বলে হুমকি দিয়েছেন দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) উপপ্রধান মোহাম্মদ আকবরজাদেহ। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার বার্তাসংস্থা বলেছে, বিপ্লবী গার্ডের উপপ্রধান বলেছেন, ‘ইরান যুদ্ধ চাইছে না। কিন্তু যুদ্ধের জন্য ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যদি যুদ্ধ বাঁধে, কোনো পিছিয়ে যাওয়া হবে না, এমনকি এক মিলিমিটারও না। ইরান সামনে এগিয়ে যাবে।’ হরমুজ প্রণালী এখন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। বিপ্লবী গার্ড প্রধান বলেছেন, “ইরান পুরোনো পদ্ধতি থেকে সরে এসে এখন বুদ্ধিদীপ্ত পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে করে সেখানে সামুদ্রিক, আকাশ এবং পানির নিচে চলাচল করে সবকিছু ইরানের সার্বক্ষণিক নজরে রয়েছে।”

এছাড়া অন্য দেশের পতাকা ব্যবহার করে বিদেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে কি না সে সিদ্ধান্তও ইরান নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যুদ্ধ শুরু করলে সেটি থেকে তাদের লাভবান হতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। মোহাম্মদ আকবরজাদেহ বলেছেন, “বিশ্ব অর্থনীতি ভুগবে ইরান চায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যে যুদ্ধ শুরু করবে তাদের সেখান থেকে লাভবান হতে দেওয়া হবে না।” তিনি বলেছেন তাদের যেসব প্রতিবেশী দেশ তাদের ভূখ-কে ইরানে হামলার জন্য ব্যবহারে অনুমতি দেবে সেসব দেশকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবেন তারা। এছাড়া ইরানের আরও অজানা সামরিক সক্ষমতাও আছে বলে দাবি করেছেন তিনি। যা যথাযথ সময়ে প্রকাশ করা হবে।