রয়টার্স

দশকের পর দশক ধরে আকাশের আধিপত্য মূলত সেসব ধনী দেশগুলোর হাতে ছিল, যারা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা এবং সেগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের খরচ বহন করতে পারত। এখন সে সমীকরণ বদলে যেতে শুরু করেছে। শত্রুর ওপর আক্রমণের জন্য সস্তায় তৈরি ড্রোন ধনী দেশগুলোর সেই সুবিধাকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে, ফলে ছোট ও কম সম্পদশালী বাহিনীগুলোও এখন প্রতিপক্ষের বেশি ক্ষতি করার সক্ষমতা অর্জন করছে। বহু বছর ধরে বিপুল পরিমাণে সামরিক বাজেটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের হাতে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নাম দিয়ে চালানো আগ্রাসনে তারা সেগুলো মোতায়েন করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে আকাশযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর যেসব সম্পদ মোতায়েন করেছে, সেগুলো দেখে নেওয়া যাক— যুক্তরাষ্ট্র মেঘের অনেক ওপর দিয়ে ওড়া প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান এ অভিযানে মোতায়েন করেছে। খরচের সমস্যা ও মোতায়েন করা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা বিলম্বের পর মার্কিন বাহিনী প্রথমবারের মতো কোনো যুদ্ধে এত ব্যাপকভাবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে তাদের বি-২ বোমারু বিমানও মোতায়েন করেছে। এই বোমারু বিমানগুলো দীর্ঘপাল্লার, স্টেলথ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা বহন করতে সক্ষম। রিফুয়েলিং ও নজরদারির জন্য কয়েকটি বৃহৎ আকারের উড়োজাহাজও মোতায়েন করা হয়েছে। আরেকটি বড় উড়োজাহাজ হলো বি-১ বোমারু বিমান, যার ডাকনাম ‘বোন’। এটি সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার পাউন্ড ওজনের মিশ্র যুদ্ধাস্ত্র ও মিশন সরঞ্জাম বহন করতে পারে এবং একবারে সর্বোচ্চ ২৪টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধরে রাখতে সক্ষম। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ‘রিপার’ ড্রোন ব্যবহার করছে। একটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে একজন পাইলট সেটি পরিচালনা করেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো তাদের এফএলএম-১৩৬ লুকাস ড্রোন ব্যবহার করছে। এটি একটি একমুখী আক্রমণ ড্রোন। ইরানের শাহেদ ড্রোনের অনুকরণে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে।

ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন: শাহেদ-১৩৬ একটি একমুখী আক্রমণ ড্রোন, লক্ষ্যবস্তুর দিকে উড়ে গিয়ে ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। ইরান কয়েক বছর ধরে এই স্বয়ংক্রিয় ড্রোন তৈরি করছে এবং মিত্রদেশগুলোতে সেগুলো সরবরাহ করেছে। এখন নিজেই বড় পরিসরে শাহেদ ড্রোন মোতায়েন করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ আগ্রাসন শুরু করে। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আছে, সেগুলো লক্ষ্য করে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

যদিও কৌশলগত দিক থেকে এই হামলা নিখুঁত নয় এবং সাফল্য নির্ভর করে এর পরিমাণের ওপর। এই কৌশলে অনেক ড্রোন একবারে নিক্ষেপ করা হয়, সেগুলো ঢেউয়ের মতো একের পর এক আক্রমণ করে আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলে, সেগুলোকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করে। এই ড্রোন তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তায় উৎপাদন করা যায়। স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সেন্টারের (সিএসআইএস) অনুমান অনুযায়ী, একটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের মতো খরচ হয়।

সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত আকাশে কীভাবে আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থার বাধা অতিক্রমের ধরন পাল্টে যাচ্ছে, বার্তা সংস্থা রয়টার্স তার চিত্র তুলে ধরেছে। হিসাব করে দেখেছে, শুধু একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর বানাতে যে অর্থ ব্যবহার করা হয়, তাতে কতগুলো ড্রোন তৈরি করা যায়। হিসাব অনুযায়ী, একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের খরচ প্রায় ৪০ লাখ ডলার, যা দিয়ে ১১৫টি একমুখী আক্রমণ ড্রোন তৈরি করা সম্ভব। সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই ইরান এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। অনুমান করা হচ্ছে, ইরান মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধের প্রযুক্তি দ্রুত বদলে যেতে দেখা গেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে তা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে ট্যাংক ও আর্টিলারির আধিপত্য দেখা গিয়েছিল, এখন এটি ক্রমেই একটি ড্রোন যুদ্ধ হয়ে উঠছে।

প্রচলিত সমরাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের দিক দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে পিছিয়ে থাকা ইউক্রেন নজরদারি ও হামলা চালাতে সস্তা ড্রোন ব্যবহার শুরু করে। যুদ্ধে রাশিয়ার হতাহতের প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে ড্রোন আক্রমণের কারণে। ড্রোনের মাধ্যমে দূর থেকে আক্রমণ চালানো যায়, এতে পাইলট ও বিমানকর্মীদের ঝুঁকি অনেক কম।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানগুলো অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ক্রুদের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, দুই আসনের এফ-১৫ যুদ্ধবিমান চালাতে পাইলটদের বহু বছর প্রশিক্ষণ নিতে হয়, যা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। যদি এমন একটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়, তবে শুধু যুদ্ধবিমানই নয় বরং ক্রুদেরও প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। বিপরীতে, সস্তা ড্রোনগুলো দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত। ড্রোন ধ্বংস হলেও অপারেটরের প্রাণহানির ঝুঁকি নেই। নতুন ড্রোন মোতায়েনের খরচ মাত্র কয়েক হাজার ডলার। এই অসাম্য একটি কৌশলগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আক্রমণ করা সহজ ও সস্তা হয়ে গেছে; অন্যদিকে, প্রতিরক্ষার খরচ আকাশছোঁয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কখনো কখনো কয়েক লাখ ডলারের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে এমন ড্রোন ধ্বংস করছে, যা সাধারণ বাজারের উপাদান দিয়ে অনেক কম খরচে তৈরি করা হয়।

ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চ খরচ: একটি থাড বা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের ‘ফুল ব্যাটারি সিস্টেমের’ খরচ ১০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। ইন্টারসেপ্টর ইউনিটের খরচ কয়েক লাখ ডলার। ২০২৪ সালের মে মাসে সিনেটের বাজেট বরাদ্দ উপকমিটিকে পেন্টাগনের প্রধান অস্ত্র ক্রেতা বিল লা প্লান্তে সতর্ক করে বলেছিলেন, আকাশ প্রতিরক্ষার অর্থনীতি অব্যাহত রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। লা প্লান্তে বলেন, ‘যদি আমরা ৫০ হাজার ডলারের একমুখী ড্রোনকে ৩০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করি, সেটি ভালো খরচের সমীকরণ নয়।’ এরই মধ্যে এই অসমতা সমুদ্রেও দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী লোহিত সাগরে চলাচল করা জাহাজকে সস্তা হুতি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষা করতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা তারও বেশি মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে।

ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কেবল খরচের একটি অংশ। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর নির্ভর করে নৌযান ও তাদের সঙ্গী জাহাজের উপস্থিতি, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত ক্রু, গোয়েন্দা ও নজরদারি সরঞ্জাম এবং হুমকি শনাক্ত ও পরাস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্কের ওপর। এ পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস ড্রোনের ব্যবহার প্রমাণ করছে যে তারা ইরানের নতুন রণকৌশলের সঙ্গে তাল মেলাতে চাইছে। নতুন এ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটন দ্রুত সময়ের মধ্যে ছোট সামরিক ড্রোন যুদ্ধে ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছে। যেমন দেশটি তাদের লো কস্ট আনক্রুড কমব্যাট এয়রিয়াল সিস্টেমের (লুকাস) মতো সিস্টেমগুলোকে প্রচলিত সময়ের চেয়ে দ্রুত অনুমোদন দিয়েছে।

গত বছরের জুলাই মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একটি নির্দেশিকা জারি করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ড্রোন আধিপত্য উন্মোচন’।এ জন্য পেন্টাগনকে জটিল প্রশাসনিক বাধা কমাতে এবং সশস্ত্র বাহিনীতে ড্রোন মোতায়েন দ্রুততর করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় হেগসেথ সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রতিবছর কোটি কোটি ড্রোন তৈরি করছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা পুরোনো ক্রয় প্রক্রিয়ার কারণে ধীরগতির হয়ে গেছে।

শাহেদ ড্রোন বনাম এফএলএম-১৩৬ লুকাস একই নকশার ড্রোন: এফএলএম-১৩৬ লুকাস ইরানের শাহেদ ড্রোনের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো একটি একমুখী আক্রমণ ব্যবস্থা। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপকভাবে এই ড্রোনের ব্যবহার করেছে। ইরানের শাহেদ ড্রোন নতুন ধরনের একটি সমরাস্ত্রকে জনপ্রিয় করেছে। এটি প্রায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কাজ করে, অথচ এটি তৈরির খরচ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খরচের চেয়ে অনেক কম।

বর্তমানে, একদিকে যেমন একমুখী আক্রমণ ড্রোনের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেগুলো সস্তা হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ড্রোনপ্রতিরোধী ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়েছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।

শাহেদ ড্রোন বনাম এফএলএম-১৩৬ লুকাস একই নকশার ড্রোন: এফএলএম-১৩৬ লুকাস ইরানের শাহেদ ড্রোনের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো একটি একমুখী আক্রমণ ব্যবস্থা। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপকভাবে এই ড্রোনের ব্যবহার করেছে। ইরানের শাহেদ ড্রোন নতুন ধরনের একটি সমরাস্ত্রকে জনপ্রিয় করেছে। এটি প্রায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কাজ করে, অথচ এটি তৈরির খরচ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খরচের চেয়ে অনেক কম।

বর্তমানে, একদিকে যেমন একমুখী আক্রমণ ড্রোনের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেগুলো সস্তা হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ড্রোনপ্রতিরোধী ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়েছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।

ড্রোন বিধ্বংসী প্রযুক্তি, যেগুলো ব্যবহার হতে পারে : সামরিক বাহিনী সস্তায় তৈরি আক্রমণাত্মক ড্রোনের বিস্তার প্রতিহত করতে নানা ধরনের প্রযুক্তির উন্নয়ন করছে। যেমন ইলেকট্রনিক জ্যামার, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন থেকে শুরু করে এমন উচ্চশক্তির লেজার, যা আলোর গতিতে লক্ষ্যবস্তুকে অক্ষম করতে সক্ষম। এসব ব্যবস্থা প্রতিরক্ষার খরচ অনেকটাই কমাতে সক্ষম হবে। কারণ, এগুলো ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে বিদ্যুৎ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এসব প্রযুক্তির বেশির ভাগই এখনো সীমিত পরিসরে ব্যবহার হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পরিবেশের বাইরে অতি সম্প্রতি এগুলোর মোতায়েন কেবল শুরু হয়েছে।