ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার উত্তরসূরি নির্বাচনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনসংক্রান্ত আলোচনা করতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের এই পর্ষদটি ইরানে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত। ওই বৈঠকে হওয়া আলোচনা সম্পর্কে জানেন এমন তিনটি সূত্র বলেছে, সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে নিহত আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি অনেকটা এগিয়ে আছেন। নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, ধর্মীয় নেতারা স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার সকালের মধ্যেই মোজতবা খামেনিকে তার বাবার উত্তরসূরি ঘোষণার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের ভয়, এটি মোজতবাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিশানায় পরিণত করতে পারে। ওই তিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের অত্যন্ত সংবেদনশীল এই অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের ওই পর্ষদ ‘অ্যাসম্বলি অব এক্সপার্টস’ নামে পরিচিত। ওই কর্মকর্তারা বলেন, এই পর্ষদ মঙ্গলবার সকালে এবং সন্ধ্যায় দুটো ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেছেন।

এদিকে ইরানের কোমে একটি ভবনে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ভবনটি শিয়া মুসলিমদের প্রধান শক্তিকেন্দ্রগুলোর একটি এবং যেখানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য ‘অ্যাসম্বলি অব এক্সপার্টসর সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বলে জানা গেছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান ও শিয়া মুসলিম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, (মোজতবা) খামেনিকে নির্বাচন অবাক করার বিষয়–ই হবে। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতও দিতে পারে। নাসর বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই তাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে ঠিক করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু গত দুই বছর ধরে মনে হয়েছে, তার ওপর থেকে নজর সরে গেছে। যদি তিনি নির্বাচিত হন; তবে তা এই ইঙ্গিত দেবে যে এটা অধিক কট্টরপন্থী ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে এসেছে, এই বাহিনী এখন দায়িত্বে আছে।’ ৫৬ বছর বয়সি মোজতবা খামেনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি খুব একটা পরিচিত নন। তিনি তার বাবার শাসনকালে ছায়ায় কাজ করেছেন। গত শনিবার ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। মোজতবা খামেনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার জন্য পরিচিত। ওই তিন কর্মকর্তার মতে, বিপ্লবী গার্ড তার নিয়োগের পক্ষে জোর দিয়েছে। তারা এই যুক্তি দেখিয়েছেন, সংকটের এই সময়ে ইরানকে পরিচালনা করার জন্য তার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে।

তেহরানের বিশ্লেষক মেহদি রহমাতি বলেন, ‘এখনকার সময়ে মোজতবা সবচেয়ে বিচক্ষণ নির্বাচন। কারণ, তিনি নিরাপত্তা ও সামরিক ব্যবস্থাগুলো পরিচালনা ও সমন্বয় করার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। তিনি আগে থেকেই এই দায়িত্বে ছিলেন।’ তবে নিশ্চিতভাবেই মোজতবাকে নির্বাচন করা হলে সবাই খুশি হবেন না—যোগ করেন এই বিশ্লেষক।

রহমাতি বলেন, ‘জনগণের একাংশ এই সিদ্ধান্তের প্রতি নেতিবাচক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তাকে নির্বাচিত করা হলে প্রতিবাদ বা বিক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে।’ রহমাতির মতে, সরকারের সমর্থকেরা মোজতবার নির্বাচনকে তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখবেন এবং দ্রুত তাকে সমর্থন দেবেন। তবে সরকারের বিরোধীরাও মোজতবাকে একই রকমভাবে বর্তমান শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখবেন, যারা কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে কয়েক মাসে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্য প্রার্থীদের মধ্যে যাঁরা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন—আলেম ও আইনজ্ঞ আলিরেজা আরাফি। তিনি তিন সদস্যের নেতৃত্ব পরিবর্তন পর্ষদের অংশ। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যজন হলেন সৈয়দ হাসান খোমেনি। তিনি ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি। ইরানের ‘অ্যাসম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পর্ষদে ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ শিয়া ধর্মীয় নেতা রয়েছেন। তারা জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, এই পর্ষদ সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ, তদারকি ও অপসারণের দায়িত্বে থাকে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এর আগে মাত্র একবার সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা হয়েছিল।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে বিশেষজ্ঞ পর্ষদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেছিল। ইরান সরকার বলেছে, শনিবারের হামলায় বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা আদেল, তার মা মানসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ এবং মোজতবার এক ছেলে নিহত হয়েছেন।