মেহের নিউজ, আল-জাজিরা : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ‘ইরানিদের হত্যার হুমকি’ মূলত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি বলে অভিহিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
গত রোববার জাতিসংঘ মহাসচিব, নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি এবং সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে তিনি এই অভিযোগ করেন। চিঠিতে আরাগচি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি সরাসরি নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রমাণ বহন করে।
এর আগে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে এ পর্যন্ত যেসব এলাকা বা জনসমষ্টিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি, এখন তাদেরও ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং নিশ্চিত মৃত্যু’র আওতায় আনা হবে।
আরাগচি তার চিঠিতে জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত ১,৩০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। হামলায় ৭,৯৪৩টি আবাসিক ইউনিট, ১৬১৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ৩২টি চিকিৎসা কেন্দ্র, ৬৫টি স্কুল এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ১৩টি ভবনসহ প্রায় ৯,৬৬৯টি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক জোর দিয়ে বলেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল একটি হুমকি নয়, বরং ইরানি জাতির বিরুদ্ধে চালানো ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভার গ্রহণের সামিল। তিনি আরও জানান, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ হলেও ইরান তার আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার বজায় রাখবে। একই সঙ্গে, চলমান এই লঙ্ঘনের ফলে সৃষ্ট জানমালের ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি দায়বদ্ধতার সম্মুখীন হবেন।
চিঠির শেষ অংশে আরাগচি জাতিসংঘ মহাসচিব এবং নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধাপরাধ বন্ধ করতে এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রেসিডেন্টকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের এই ধারা ভবিষ্যতে আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
‘ইরানকে বিভক্ত ও তেল লুটের ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে বলেছেন, ওয়াশিংটন মূলত ইরানকে খণ্ডিত করে দেশটির বিশাল তেল সম্পদ লুট করার নীল নকশা তৈরি করেছে।
সোমবার (৯ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় মার্কিন তৎপরতার সমালোচনা করে বলেন, আমেরিকানদের এই পরিকল্পনার পেছনের উদ্দেশ্য এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করা এবং অবৈধভাবে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
বাঘাই আরও মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থেই নয়, বরং ইরানি জনগণকে পরাজিত করতে এবং তাদের মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে এই সংঘাত উসকে দিচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের ভূখণ্ডকে খণ্ডিত করার যেকোনো অপচেষ্টা বা সম্পদ চুরির উদ্যোগ ইরান কঠোরভাবে প্রতিহত করবে।
বর্তমান আঞ্চলিক উত্তজনার প্রেক্ষাপটে বাঘাইয়ের এই বক্তব্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধকে আরও তিক্ত করে তুলেছে।