সংগ্রাম ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে সমঝোতা ‘প্রায় চূড়ান্ত’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শিগগিরই চুক্তির বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
গত শনিবার ট্রাম্প বলেন, এ চুক্তির মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ নিয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি তিনি। বিবিসি, এএফপি, আল-জাজিরা, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস্
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি এসেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর অর্থ এ নয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়ে গেছে। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘পরস্পরবিরোধী বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগও তোলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘শান্তি-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক’ নিয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গে তাঁর ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের মধ্যে একটি চুক্তি নিয়ে বেশির ভাগ আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে; এখন শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন ও সমাপ্তি হওয়া বাকি।’
বর্তমানে চুক্তির চূড়ান্ত দিক ও বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে এবং খুব শিগগির তা ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছে এবং ফোনালাপ ‘খুব ভালোভাবে’ সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সম্ভাব্য চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য না দিলেও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো চুক্তিই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ‘অবশ্যই’ বিরত রাখবে।
পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার অসাধারণ প্রচেষ্টার জন্য আমি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানাই।’ তাদের (ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু) ফোনালাপ ‘খুব ফলপ্রসূ ও কার্যকর’ হয়েছে বলেও জানান শাহবাজ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ শান্তি চুক্তি আলোচনায় পাকিস্তান সহায়তা করছে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে শাহবাজ লেখেন, ‘আমরা খুব শিগগির পরবর্তী দফার আলোচনা আয়োজনের আশা করছি।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তিতে যেসব বিষয় থাকতে পারে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান সমঝোতা আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগরেহিও গত সপ্তাহেই দুই পক্ষের অবস্থান কাছাকাছি আসার কথা জানিয়েছেন।যুদ্ধ বন্ধের এই চুক্তি হলে তাতে কী কী বিষয় থাকতে পারে, সে বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। তাতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হতে পারে। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম টানার বিষয়ে আলোচনা চলমান।
একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
# যুদ্ধবিরতির এ সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে কোনো টোল আদায় করা হবে না। তা ছাড়া হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করবে ইরান।
# ইরানের বন্দরগুলো থেকে অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে ইরানের জ্বালানি তেলের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞায় কিছু ছাড় দেবে ওয়াশিংটন।
# ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করবে না—সেই প্রতিশ্রুতি দেবে দেশটি। তা ছাড়া ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষ আরও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাবে।
# অবরুদ্ধ করা ইরানের বিভিন্ন তহবিল থেকে দেশটিকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
# ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়ে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থান করবে মার্কিন বাহিনী। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করবে ওয়াশিংটন।
দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে এই চুক্তির মেয়াদ ৬০ দিন পরও বাড়ানো যেতে পারে বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব খবর স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি বিবিসি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম ত্যাগ করার প্রতিশ্রুতিও প্রস্তাবে রয়েছে।
সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোয় রাজি হয়নি ইরান
ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করতে সম্মত হয়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান প্রাথমিক সমঝোতায় পারমাণবিক ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না উল্লেখ করে ওই সূত্রটি জানায়, পারমাণবিক বিষয়টি নিয়ে কেবল একটি চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যেই আলোচনা করা হবে, যা বর্তমান চুক্তির অংশ নয়। ফলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা হয়নি।
ইরানী কর্মকর্তার এই বক্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যার ঠিক আগেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে দাবি করেছিল, ইরান তার ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করতে নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।
তবে সেটি ঠিক কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় করা হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান আলোচনায় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, চুক্তি স্বাক্ষরের পর শুরু হতে যাওয়া পরবর্তী দফার আলোচনায় এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খসড়া চুক্তিতে ইরানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু বড় প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেবে এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পুরোপুরি সরিয়ে ফেলবে।
তবে খসড়া চুক্তির এই দাবি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের বিপরীতে ইরানের শীর্ষপর্যায়ের এই অস্বীকৃতি চলমান আলোচনাকে নতুন এক কূটনৈতিক জটিলতার মুখে দাঁড় করালো।