রয়টার্স, আল-জাজিরা, এএফপি
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের দেশ ইয়েমেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ধর্মপ্রাণ মানুষের এই দেশটিকে বলা হয় আরব সংস্কৃতির দর্পণ। যুদ্ধ-বিগ্রহ আর অর্থনৈতিক সংকটের মেঘ মাঝেমধ্যে এই জনপদকে ঘিরে ধরলেও, রমজান এলে এখানে বইতে শুরু করে অনাবিল প্রশান্তির হাওয়া। ইয়েমেনিদের কাছে রমজান মানে কেবল উপবাস নয়, বরং এটি ত্যাগ, আতিথেয়তা এবং সামাজিক সংহতির এক অনন্য উৎসব।
আতিথেয়তার নাম ‘দুয়ুফুত ত্বরিক’ : ইয়েমেনের রমজান সংস্কৃতির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো ‘দুয়ুফুত ত্বরিক’ বা 'পথের অতিথি’ প্রথা। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে ইয়েমেনের শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। বিত্তবান থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ীরা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন। কোনো পথচারী বা মুসাফিরকে দেখলেই তারা প্রায় জোরাজুরি করে নিজেদের বাড়িতে বা মহল্লার ইফতার মাহফিলে নিয়ে যান। ‘ইব’ শহরের এক ব্যবসায়ীর কথা, যিনি কয়েক দশক ধরে এই প্রথা পালন করছেন। তিনি জানান, বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আগন্তুকদের ইফতারে নিমন্ত্রণ জানানো তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। তাদের বিশ্বাস, রমজানে খাবারে বরকত থাকে এবং আগন্তুকদের খাওয়ালে সেই বরকত বহুগুণ বেড়ে যায়। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতির কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও এই আতিথেয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।
রমজানে ইবাদতের আবহ : ইয়েমেনিদের কাছে রমজান হলো আত্মশুদ্ধির মাস। মাসটি আসার আগেই মসজিদগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় এবং বিশেষ ইবাদতের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অফিস-আদালতের সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন আসে। দিনের বেলা রাস্তাঘাট কিছুটা জনশূন্য থাকলেও জোহর নামাজের পর থেকে প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়। ছোট ছোট শিশুরা পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও আমল-আখলাকের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। পুরো দেশের বায়ুম-লে এক আধ্যাত্মিক সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।
ইয়েমেনি ইফতারের দস্তরখান : ইয়েমেনি ইফতার যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি পুষ্টিকর। মাগরিবের আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সুন্নত মেনে খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এরপর তাদের দস্তরখানে সাজানো থাকে ঐতিহ্যবাহী সব খাবার। যেমন: সাফুত: এটি ইয়েমেনের ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ ধরনের ‘লাহোহ’ রুটির ওপর টক দই, পুদিনা পাতা এবং মশলার মিশ্রণ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়।
শুরুবা: এটি মূলত ওটস বা গমের তৈরি এক ধরনের স্যুপ, যা দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর পেটকে আরাম দেয়। সামবুসা: আমাদের দেশের সমুচার মতো দেখতে এই খাবারটি মাংস বা সবজির পুর দিয়ে তৈরি করা হয়, যা ইয়েমেনিদের অত্যন্ত প্রিয়। বেন্ত আল-সাহান: এটি মধুর আস্তরণ দেওয়া এক ধরনের কয়েক স্তরের কেক বা রুটি, যা মিষ্টি জাতীয় খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয়।
রাতের মূল খাবারে তারা সাধারণত ‘কাবসা’ (চাল ও মাংসের বিশেষ পদ) বা ‘মান্দি’ খেয়ে থাকেন। আর সাহরিতে তারা খুব ভারী খাবার এড়িয়ে চলেন। খেজুর, দুধ, জুস এবং পাতলা রুটির সঙ্গে চা বা বিখ্যাত ইয়েমেনি কফি দিয়েই তাদের সাহরি সম্পন্ন হয়।
সংকট ও সম্প্রীতির সহাবস্থান : বর্তমানে ইয়েমেন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আল-জাজিরার তথ্যমতে, লোহিত সাগরে অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। অনেক পরিবার এখন কেবল প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করে রমজান কাটায়। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ কমেনি। ইব বা হাজ্জাহর মতো পাহাড়ি গ্রামগুলোতে আজও নিয়ম আছেÍকোনো আগন্তুক যদি ইফতারের সময় গ্রাম পার হতে চান, তবে তাকে না খাইয়ে যেতে দেওয়া হবে না। গ্রামের প্রধানরা রাস্তার ধারে তাবু খাটিয়ে বা মসজিদের সামনে ঢালাও ইফতারের আয়োজন করেন।