বিশ্বের তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ (Winding Down) ইঙ্গিত দিচ্ছেন, অন্যদিকে যুদ্ধের ময়দানে আরও ২ হাজার ৫০০ নৌ-সেনা (Marines) মোতায়েন এবং কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল যুদ্ধ তহবিলের আবদার করেছেন। ট্রাম্পের এই বৈপরীত্যপূর্ণ অবস্থান বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের ‘মিশ্র বার্তা’ ও তেলের বাজার
শুক্রবার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের ‘মহান সামরিক প্রচেষ্টা’ গুটিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বার্তার পেছনে রয়েছে মার্কিন অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা। যুদ্ধের প্রভাবে তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং শেয়ার বাজারের ধস সামাল দিতেই ট্রাম্পের এই কৌশল। এরই মধ্যে জাহাজে থাকা ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে হোয়াইট হাউস, যাতে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
অপারেশন এপিক ফিউরি: চার থেকে ছয় সপ্তাহের লক্ষ্য?
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী এই মিশন শেষ করতে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগবে। বর্তমান সময়কে যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ইরানি শাসনব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পড়েছে।
তবে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত স্পষ্ট করেনি যে, তাদের বিজয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি আসলে কী।
নওরোজের দিনেও থামেনি রক্তপাত
পারস্য নববর্ষ ‘নওরোজ’-এর প্রথম দিনটিতেও ইরানিরা শান্তিতে কাটাতে পারেনি। তেহরানসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের হামলা অব্যাহত রয়েছে। উত্তর ইরানের গুইলান প্রদেশের দস্তক গ্রামে আবাসিক এলাকায় গোলার আঘাতে অন্তত দুইজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানও বসে নেই; আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ভারত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন ও ব্রিটিশ যৌথ সামরিক ঘাঁটি ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে ইরান।
মোজতবা খামেনির হুংকার ও ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বিবৃতিতে বর্তমান যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘মস্ত বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইরান তার শত্রুদের ওপর ‘মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো আঘাত’ হেনেছে। উল্লেখ্য, ইসরায়েলি হামলায় পিতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরিসংখ্যান
গত তিন সপ্তাহের এই অসম যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লেবাননে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে নিহত হয়েছেন ১ হাজারের বেশি মানুষ। অন্যদিকে ইরানের মিসাইল হামলায় ইসরায়েলে ১৮ জন এবং এ পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
মুসলিম বিশ্বের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কখনো বলছে তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করতে চায়, আবার কখনো বলছে শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে চায়। তাদের এই দোদুল্যমান নীতির কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আজ ধ্বংসের কিনারে। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আরও সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে আসায় যুদ্ধের স্থায়িত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম সংশয়।
সূত্র: আলজাজিরা