যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসলামিক রেভ্যুলেশনারী গার্ড কোর এ পর্যন্ত সবচেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান শুরু করেছে। তারা তেলআবিবের দক্ষিণে অবস্থিত হায়েলা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালিয়েছে। এছাড়া কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি আগ্রাসী দুই দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি ও তাদের অবকাঠামোকে নতুন লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এর বাইরে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা দুঃসাধ্য বলে স্বীকার করেছে ইসরাইলী আইডিএফ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৭টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবশেষে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তার অপারগতা প্রকাশ করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। রয়টার্স, এএফপি, ফার্স নিউজ এজেন্সি, তাসনিম, নিউইয়র্ক টাইমস।
সবচেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী
অভিযান শুরু ইরানের
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ‘সবচেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী’ সামরিক অভিযান শুরু করেছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইরানের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, তারা তেলআবিবের দক্ষিণে অবস্থিত হায়েলা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া বির ইয়াকুব, পশ্চিম জেরুজালেম ও হাইফার বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ইরাকের ইরবিলে অবস্থিত মার্কিনঘাঁটি এবং বাহরাইনের মানামায় যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।
এদিকে ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার পর হামলার গতি বাড়িয়েছে তেহরান। ব্যবহার করছে আগের চেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। দফায় দফায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে গণহত্যাকারী ইসরাইলে।ইসরাইলে হামলায় ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক অংশেই গুচ্ছবোমা বা ক্লাস্টার বোমা ওয়ারহেড ব্যবহার করেছে বলে দাবি করেছে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অংশ হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। বুধবার আইআরজিসির পরিচালিত সংবাদমাধ্যম সিপাহ নিউজের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
সিপাহ নিউজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের প্রধান কেন্দ্র মিনা সালমান বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একই সময়ে কুয়েতের ক্যাম্প প্যাট্রিয়ট ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে মোহাম্মদ আল-আহমদ এবং আলী আল-সালেম নৌঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের সরঞ্জামের হ্যাঙ্গার, আবাসন এবং সমাবেশ কেন্দ্রগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
এছাড়া কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিং ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের এই বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
এর আগে, একই দিনে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। বুধবারের এই হামলায় বিমানবন্দরের কাছে ইরানের ছোড়া দুটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। এতে এক বাংলাদেশী প্রবাসীসহ অন্তত চারজন আহত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে দুবাই মিডিয়া অফিস বলেছে, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একেবারে কাছাকাছি এলাকায় দু’টি ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তবে হামলার পরও বিমানবন্দরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
ইসরাইল ও মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত মঙ্গলবার ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ও ইরানের স্থানীয় বাসিন্দারা হামলাকে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে তীব্র হামলা বলে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, তারাও গতকাল কাতারে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি এবং ইরাকের কুর্দিস্তানে আল-হারির ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের জুফায়ের নৌঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের ওপর ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আজ বুধবার ভোরে বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আরও একটি হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ভোরে ইরান থেকে ইসরাইলের কেন্দ্রস্থল লক্ষ্য করে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথাও বলা হয়েছে।
ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে রকেটগুলো প্রতিহত করার সময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ সময় বিমান হামলাজনিত সতর্কসংকেত বাজতে থাকলে ইসরাইলীরা নিরাপদ কক্ষ ও আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে যান। কোনো ক্ষেপণাস্ত্র মাটিতে পড়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রায় একই সময়ে লেবাননের বৈরুতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলী বাহিনী। লেবাননে ইরানসমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার লক্ষ্যে এমন হামলা চালানো হচ্ছে। হিজবুল্লাহ ইরান সরকারের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরাইলে হামলা চালাচ্ছে। হোয়াইট হাউস আবারও বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার যেকোনো পদক্ষেপের জবাবে ইরানে শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। যুদ্ধের কারণে এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের পরিবহন কার্যত থমকে গেছে। এ ছাড়া হোয়াইট হাউস আবারও ঘোষণা দিয়েছে, কেউ চাইলে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিরাপদে পার করে দেবে।
গতকাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগণের এক ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, ‘আজও ইরানের ভেতরে আমাদের সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন হবে। সবচেয়ে বেশি যোদ্ধা, সবচেয়ে বেশি বোমারু বিমান ব্যবহার করা হবে, সবচেয়ে বেশি হামলা হবে, গোয়েন্দা তথ্য আরও নিখুঁত ও আগের চেয়ে ভালো হবে।’ দিনের শেষ দিকে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘গত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমরা ইরানের ১০টি “নিস্ক্রিয় মাইন” বসানো জাহাজকে আঘাত করে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছি।’ এ হামলাগুলো কোথায় হয়েছে, তা ট্রাম্প স্পস্ট করেননি। তেহরানের বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তাঁরাও বলেছেন, গতকাল রাত ছিল চলমান যুদ্ধে সবচেয়ে তীব্র হামলার রাত। এক বাসিন্দা ফোনে রয়টার্সকে বলেন, ‘এটিকে নারকীয় মনে হচ্ছিল। তারা তেহরানের সব জায়গায় বোমা ছুড়ছিল।’
গুগলসহ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পৃক্ত
প্রযুক্তি কোম্পানি টার্গেট করবে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি ও তাদের অবকাঠামোকে নতুন লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইসরাইলের সঙ্গে সংযোগ আছে এমন শীর্ষ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির অফিস ও অবকাঠামোর একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এসব প্রযুক্তি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় সেগুলো এখন ‘ইরানের নতুন লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তালিকায় গুগল, মাইক্রোসফট, প্যালান্টির, আইবিএম, এনভিডিয়া ও ওরাকল–এর নাম রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্লাউডভিত্তিক সেবার অফিস ও অবকাঠামো ইসরাইলের বিভিন্ন শহর ছাড়াও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশেও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যুদ্ধ যখন অবকাঠামোগত যুদ্ধের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে, তখন ইরানের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’র পরিধিও বাড়ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে অঞ্চলজুড়ে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও ব্যাংকেও হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। খাতাম আল-আনবিয়া সদরদপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, ইরানের একটি ব্যাংকের ওপর হামলার পর শত্রুরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, এখন অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নিস্ট শাসনব্যবস্থা’ সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব ব্যাংকের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে সাধারণ মানুষকে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা দুঃসাধ্য
ইসরাইলে হামলায় ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক অংশেই গুচ্ছবোমা বা ক্লাস্টার বোমা ওয়ারহেড ব্যবহার করেছে বলে দাবি করেছে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। প্রকাশিত আইডিএফের এক বিশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইরান যুদ্ধের ময়দানে বিধ্বংসী ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। খবর এপির। আইডিএফের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই বিশেষ ওয়ারহেডগুলো লক্ষ্যবস্তুর আকাশে পৌঁছানোর পর কয়েক ডজন ক্ষুদ্র সাব-মিউনিশনে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রতিটি ক্ষুদ্র বোমায় কয়েক কেজি করে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক থাকে, যা প্রায় ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষতি নিশ্চিত করতে সক্ষম।
ইসরাইলী সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। যদিও ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কার্যকর, তবে আইডিএফ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে কোনো ব্যবস্থাই পুরোপুরি নিচ্ছিদ্র নয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করলেও এর ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র বোমাগুলো নিচে পড়ে বড় ধরনের বিপদ ঘটাতে পারে। আইডিএফের হোম ফ্রন্ট কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইরান কেবল সামরিক স্থাপনা নয়, বরং জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। গত সোমবার মধ্য ইসরাইলের একটি নির্মাণাধীন এলাকায় ক্লাস্টার বোমার আঘাতে দুজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং আরও কয়েকটি স্থানে বড় ধরনের ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, ইরান বর্তমানে একযোগে অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়ে অল্প সংখ্যক কিন্তু শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। ধারণা করা হচ্ছে, বড় আকারের সমন্বিত হামলা চালাতে তেহরান কিছুটা সমস্যার মুখে থাকলেও গুচ্ছবোমার মাধ্যমে তারা সীমিত হামলাতেই সর্বোচ্চ ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৭টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৭টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেহরানের পাল্টা আঘাতের মাত্রা দেখে মনে হচ্ছে; ধারণার চেয়েও তাদের প্রস্তুতি বেশি ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে সেগুলোর মধ্যে আছে মার্কিন দূতাবাস, সামরিক ঘাঁটি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দুটি স্থাপনায় হামলায় সাতজন সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিও যাচাই করে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭টি স্থাপনা শনাক্ত করেছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন। তারা বলছেন, অধিকাংশ হামলাই যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা প্রতিহত করেছে। তবুও অন্তত ১১টি সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যা অঞ্চলটিতে থাকা মোট স্থাপনার প্রায় অর্ধেক। যুদ্ধের প্রথম দিন ইরান কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর মধ্যে ছিল সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেস, কুয়েতের আলি আল সালেম এয়ারবেস, ক্যাম্প বুয়েরিং এবং কাতারের আল উদেইদ এয়ারবেস। উদেইদ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। ইরানের পাল্টা হামলায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে পেন্টগনের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে কংগ্রেসে জানানো হয়, প্রথম দিনের হামলায় বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে প্রায় ২০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর তুলনায় ইরানের হামলার গতি কিছুটা কমেছে। তবে আক্রমণ থেমে নেই। আল উদেইদ এয়ারবেস, আলি আল সালেম এয়ারবেস, আল ধাফরা এয়ারবেস, ক্যাম্প বুয়েরিং এবং পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে একাধিকবার হামলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যা স্থাপন করা বেশ ব্যয়বহুল। ইরান পরিকল্পিতভাবে সেখানেও হামলা করেছে। এরমধ্যে আছে টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থার উপাদান। শক্তিশালী রাডারের মাধ্যমে আকাশপথের হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার হয়। সামরিক বাজেট ও চুক্তির নথি অনুযায়ী, এ ধরনের একটি রাডার ইউনিটের মূল্য প্রায় ৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া, বেসামরিক মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করেও ইরান হামলা চালিয়েছে। যেমন- দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট এবং কুয়েত সিটি ও সৌদি আরবের রিয়াদে দূতাবাস। এসব হামলার কারণে সাময়িকভাবে সেগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে এসব হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তায় অপরাগতা
প্রকাশ মার্কিন নৌবাহিনীর
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি হয়ে যাতায়াত করা কোনও জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। এ কারণে ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজের নিয়মিত অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর নতুন এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রফতানিতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘœ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট বলেছেন, প্রয়োজন হলে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ পানিপথে নিয়মিত জাহাজ পুনরায় চলাচল শুরু করার জন্য এসকর্ট দিতে প্রস্তুত নৌবাহিনী।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের শুরু থেকেই সরু এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রফতানি বাধার মুখে পড়েছে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালির ব্যাপারে গত সপ্তাহেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রণালিটি এখন বন্ধ রয়েছে এবং সেখান দিয়ে কোনও জাহাজ চলাচলের চেষ্টা চালালে গুলী চালাবে ইরান। দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিপিং শিল্পের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে শিপিং ও তেল শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছে। কিন্তু তারা এসব বৈঠকে জানিয়েছে, আপাতত সামরিক নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে জাহাজগুলোকে প্রণালিটি অতিক্রম করানোর সক্ষমতা নেই তাদের। সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, এসব বৈঠকে শিপিং শিল্পের প্রতিনিধিরা প্রায়দিনই নৌবাহিনীর কাছে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সামরিক নিরাপত্তা চেয়ে অনুরোধ জানাচ্ছে।