এএনআই : ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন ও অধিকার খর্বের অভিযোগে ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা–বিষয়ক কমিশন বা ‘ইউএসসিআইআরএফ’। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ বা ‘র’–কেও।
চলতি বছর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যেন এই আলোয় তাদের বাণিজ্যনীতি ও অস্ত্র বিক্রির সময় ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখে।
বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় আরএসএসের সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও তার সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়কে বিবেচনায় আনা উচিত। এর আগে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব, দাঙ্গায় প্ররোচনাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মার্কিন সরকার ভারতের তৎকালীন বিজেপি নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর অবশ্য সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এই প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে অতীতে এই সংগঠনের প্রতিবেদনকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক’ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে মন্তব্য করেছিল।
কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার হাল আরও খারাপ হয়েছে। ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও তাঁদের উপাসনালয় হামলার শিকার হচ্ছে। ভারত সরকারই সে জন্য দায়ী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন রাজ্যে জবরদস্তি ধর্মান্তকরণ ঠেকাতে কঠোর আইন তৈরি করা হচ্ছে। সেই আইনে এ–জাতীয় অপরাধের কঠোরতর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। বহু নাগরিককে বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নাগরিকদের বেআইনিভাবে বহিষ্কার করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারির নামে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন রাজ্যের এ ধরনের ঘটনাবলির উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। যেমন আওরঙ্গজেবের সমাধি তুলে দেওয়ার চেষ্টায় মহারাষ্ট্রে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সহিংস আন্দোলন ও তাকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা। কিংবা গত বছরের জুন মাসে ওডিশায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণে ২০টি খ্রিষ্টান পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। ওই খ্রিষ্টান পরিবারের সদস্যরা জবরদস্তি ধর্মান্তরকরণে আপত্তি জানিয়েছিলেন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ সেই আক্রমণ ঠেকায়নি। এ কারণে আটজন আহত হন।
মার্কিন প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনে পেহেলগামে হামলার ঘটনাটিও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ওই হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পাঁচ দিন সংঘাত চলে। তার জেরে ইসলামবিরোধিতা প্রকট হয়। উত্তর প্রদেশ ও কর্ণাটকে ঘৃণা অপরাধে মুসলিমরা নিহত হন। গত মে মাসে ভারত সরকার ১৫ জন খ্রিষ্টানসহ ৪০ জন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মিয়ানমার উপকূলে নিয়ে গিয়ে সাঁতরে চলে যেতে বলা হয়। লাইফজ্যাকেট ছাড়া তাঁদের আর কিছুই দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও গত বছরের জুলাইয়ে কয়েক শ বাংলাভাষী মুসলিমকে জোর করে আসাম থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। বিজেপি নেতাদের চোখে তাঁরা ‘অনুপ্রবেশকারী’। তাঁদের ঠেকাতেই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিদেশি আইনে নতুন ধারা ও বিধান চালু করা হয়েছে। ওয়াক্ফ আইনে মুসলিমদের ধর্মীয় সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিএএ ও ধর্মান্তরকরণবিরোধী আইনের পাশাপাশি গোরক্ষকদের স্বার্থে তৈরি আইন ও তার প্রয়োগের উল্লেখ করা মার্কিন কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উমর খালিদ ও শারজিল আলমের মতো বহু অধিকারকর্মীকে বিনা বিচারে পাঁচ বছর ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ লেখা পোস্টার–ব্যানার টাঙানোর ‘অপরাধে’ অগুনতি মানুষকে ধরপাকড় করা হয়েছে। মামলাও করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কমিশন একটি স্বাধীন, স্বশাসিত ও সরকারি সংস্থা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণ করে তারা প্রতিবেদন পেশ করে। সেই প্রতিবেদনের আলোয় তারা মার্কিন সরকারকে নীতি নির্ধারণের সুপারিশ করে। তবে এই সুপারিশ মানা বাধ্যতামূলক নয়। সরকার তা মানতেও পারে, না–ও পারে।
ইউএসসিআইআরএফ ভারতসহ পৃথিবীর ১৮টি দেশকে ‘বিশেষ উদ্বেগজনক’ বলে চিহ্নিত করেছে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, মিয়ানমার, চীন, কিউবা, ইরিত্রিয়া, ইরান, লিবিয়া, নিকারাগুয়া, নাইজিরিয়া, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও ভিয়েতনাম।