আল-জাজিরা : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আগুন জ্বলছে। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরানও। প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালাচ্চে তেহরান। এতে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধের জেরে বন্ধ হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি।

এই যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত দ্বীপ কেশম শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি পরিণত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্রবিন্দুতে। দ্বীপটির মাটির নিচে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নতুন করে বিশ্বের নজর কেড়েছে। সংবাদমাধ্যম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে একসময় পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত অদ্ভুত শিলা গঠন আর ম্যানগ্রোভ বনের সৌন্দর্য দেখতে। সেই দ্বীপই এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্র। কারণ এর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে ইরানের তথাকথিত ‘ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর কেশমের চেহারা বদলে গেছে। আগে এটি ছিল মুক্তবাণিজ্য ও পর্যটনের কেন্দ্র, আর এখন এটি পরিণত হয়েছে সামরিক দুর্গে। হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে অবস্থান করায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন বাহিনীর জন্যও বড় লক্ষ্যবস্তু। প্রায় এক হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি উপসাগর থেকে প্রণালিতে প্রবেশের পথ নিয়ন্ত্রণের মতো অবস্থানে রয়েছে। ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দ্বীপটিতে প্রায় এক লাখ ৪৮ হাজার মানুষ বাস করে, যাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম। সেখানকার বাসিন্দারা ‘বান্দারি’ নামে একটি বিশেষ উপভাষায় কথা বলে। তাদের জীবন এখনও সাগরকেন্দ্রিক। প্রতি বছর ‘নওরোজ সাইয়াদি’ বা জেলেদের নববর্ষ উপলক্ষে মাছ ধরা বন্ধ রেখে সাগরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

তবে যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পর, ৭ মার্চ দ্বীপটির একটি গুরুত্বপূর্ণ লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান এটিকে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘স্পষ্ট অপরাধ’ বলে আখ্যা দেয়। এই হামলার ফলে আশপাশের ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বাহরাইনের জুফাইর ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। তাদের দাবি, কেশমে হামলা পাশের একটি উপসাগরীয় দেশ থেকে পরিচালিত হয়েছিল।

হরমুজ প্রণালির মিসাইল শহর ও সামরিক গুরুত্ব: ১৯৮৯ সাল থেকে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলেও এখন কেশমকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের ‘অডুবন্ত বিমানবাহী জাহাজ’ হিসেবে দেখছেন। বন্দর আব্বাস শহর থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি প্রণালির নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে ইরানের দ্রুতগতির নৌযান ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ জটিল নেটওয়ার্কে লুকানো রয়েছে।

লেবাননের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান জৌনি বলেন, কেশমে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল শহর’ রয়েছে এবং সেখানে ইরানের আক্রমণক্ষমতা সঞ্চিত আছে। এর মূল উদ্দেশ্য— হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ বা প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়া।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হুমকির কারণে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কেবল অল্প কিছু জাহাজকে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য যেতে দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজাহাজের বহর গঠন করে এই পথ খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ইতিহাসে সমৃদ্ধ কেশম: কেশম দ্বীপের ইতিহাসও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। আরবিতে একে বলা হয় ‘জাজিরাত আল-তাওয়িলা’ বা দীর্ঘ দ্বীপ। বিভিন্ন সাম্রাজ্যের হাত ঘুরে এর পরিচয় গড়ে উঠেছে। গ্রিক অভিযাত্রী নিয়ারখাস একে ‘ওআরাক্টা’ নামে উল্লেখ করেছিলেন। নবম শতকে ইসলামী ভূগোলবিদরা একে ‘আবারকাওয়ান’ নামে ডাকতেন, যা পরে ‘গাভান দ্বীপ’ নামেও পরিচিত হয়।

১৩০১ সালে তাতারদের আক্রমণ এড়াতে হরমুজের শাসকরা তাদের দরবার এই দ্বীপে সরিয়ে নেন। দীর্ঘ সময় এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য পানির প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৫৫২ সালে অটোমান নৌ-কমান্ডার পিরি রেইস দ্বীপটি দখল করে বিপুল সম্পদ হস্তগত করেন। ১৬২১ সালে পর্তুগিজরা এখানে একটি বড় দুর্গ নির্মাণ করে। তবে এক বছর পর পারস্য ও ইংরেজদের যৌথ অভিযানে তারা বিতাড়িত হয়। ওই যুদ্ধে ব্রিটিশ নাবিক উইলিয়াম ব্যাফিন নিহত হন।

১৯শ’ শতকে ব্রিটিশরা বাসিদু এলাকায় নৌঘাঁটি স্থাপন করে এবং সেটি ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। পরে ১৯৩৫ সালে ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলভির অনুরোধে তারা ঘাঁটিটি পরিত্যাগ করে।

প্রাকৃতিক বিস্ময়ের দ্বীপ: সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি কেশম এখনও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জীববৈচিত্যে সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে রয়েছে ‘হারা’ ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত কেশম জিওপার্ক। দ্বীপটির উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে— স্টারস ভ্যালি: হাজার বছরের ক্ষয়ে তৈরি শিলা ও উপত্যকার বিস্ময়কর গঠন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, উল্কাপাতের ফলে এর সৃষ্টি হয়েছিল। নামাকদান লবণ গুহা: বিশ্বের দীর্ঘতম লবণ গুহাগুলোর একটি। এর দৈর্ঘ্য ৬ কিলোমিটারের বেশি।